যদি বলা হয় দেশ এখন জ্বালানি সংকট-জ্বরে কাঁপছে, তা কি ভুল বলা হবে? এ-সংকট সাময়িক, এটাই আমাদের স্বস্তি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলার ভেতর দিয়ে এর সূচনা হলেও, এর অভিঘাত জ্বালানি ছেড়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটে মোড় নিতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের মন্তব্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ ভূ-রাজনীতির সব হিসাবনিকাশ উল্টে দিতে বসেছে। রাশিয়া ও চীন ইরানের পাশে দাঁড়ানোর ফলে, যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। আমেরিকা স্থল বাহিনী মোতায়েন করায়, যুদ্ধের মাত্রা বেড়েছে। সম্মুখ সমরে, কে হারে কে জেতে এই বিশ্লেষণ বিশ্ববাসীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায়, ওই এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সে হুমকি দিয়েছে, পারস্য উপসাগরের খারগ দ্বীপ ধ্বংস করে দেবে। ওই দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। সেখান থেকে গোটা প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। এদিকে উদীয়মান অর্থনীতির বাংলাদেশ, বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আমদানির জন্য আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। এই তালিকায় ব্রুনেই কেবল নয়, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখ, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়েছে সরকার। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয় পরিশোধিত তেল।
রাশিয়ার তেল যাতে কিনতে পারে বাংলাদেশ, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার ওপর অবরোধ থাকায় এই পারমিশন আমাদের জন্য খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি দিলে, হরমুজ প্রণালি দিয়েই রাশিয়ার তেল আমরা আনতে পারি। এভাবে সংকট মোকাবিলার পথ খুলতে চাইলেও, খোদ রাজধানীসহ প্রান্তিক শহরগুলোতে ডিজেল বাদে অকটেন, পেট্রোল সংকট তীব্র। বাইকার ও মোটরকারওয়ালাদের উদগ্র চাহিদার দরুন চোরাকারবারি ও সিন্ডিকেট এই খাতে লোভের তেল বিক্রি করছে উচ্চমূল্যে। ছোট ছোট অসংখ্য দোকানে অকটেন, পেট্রোল কী করে পাওয়া যায় পাম্পে যা পাওয়া যায় না, এই রহস্য ভেদ করতে হবে সরকারকে। সিন্ডিকেট ও অবৈধ দোকানিরা কোথা থেকে পেট্রোল ও অকটেন পায়, সেই উৎস ভেঙে দিতে হবে। দুই-চারজনকে জেল-জরিমানা করে লোভের এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন টাস্কফোর্স নিয়োগ করে সিন্ডিকেটের হোতাদের আটক করা। যাদের ইশারায় বৈধ ও অবৈধ পাম্পগুলো রাতারাতি অকটেন, পেট্রোল চোরাইদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এই ব্যবসা বন্ধ করা জরুরি। একজন সাংসদ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার বিপরীতে যে তীব্র বিতর্কের শুরু হয়েছিল, তা সংসদকে প্রাণবন্ত করলেও, জ¦ালানি সংকট সমাধানে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। কেবল পেট্রোল অকটেনের সিন্ডিকেটই নয়, নিত্যপণ্যের বাজারেও ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সিন্ডিকেট আছে। ওই সিন্ডিকেট বাসাগুলো ধসিয়ে দিতে না পারলে সরকার যেসব কল্যাণকর প্রকল্প নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে, তা বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। সম্মিলিতভাবে, সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদদের তেল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে উদ্যোগী হতে হবে। ডিও লেটার ধরে ধরে প্রত্যেক ডিলার পাম্পের কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।
কোন কোন গাড়িতে তেল বিক্রি করেছেন, তার রিসিট দিতে হবে। কে কতবার পেট্রোল বা অকটেন নিয়েছে, সেই হিসাবও দিতে হবে। যারা বাড়তি দাম চাইবে, তা হোক বৈধ বা অবৈধ, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলমান সংকট নিরসন সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ বাজারের সংকটকে যুদ্ধের দামামার সঙ্গে মেলাবেন না। তেল বিক্রির ক্ষেত্রে রেশনিং করতে হবে। একমাত্র ডিজেলের ক্ষেত্রে কৃষক কার্ড ছাড়া এক ফোঁটা ডিজেলও যেন না দেওয়া হয়, তা মেনে চলতে হবে। কেবল যুদ্ধের ওপর দায় দিয়ে এমন সিন্ডিকেট করা কি তেল ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক অভিসন্ধি নাকি দেশকে সংকটে ফেলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের এই মানবতাবিরোধী খেলায় যুক্ত থাকবেন তারা?