উপসাগরীয় অঞ্চলে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু পাল্টাপাল্টি হামলায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ প্রতিদিনই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য) তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটির সংঘাত বিশ্ব বাজারেও প্রভাব ফেলেছে; ইতিমধ্যে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই সংঘাত অবসানের উদ্যোগ নিয়েছে মুসলিমপ্রধান ৪ দেশ। গত রবিবার ইসলামাবাদে মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকটি কেবল ইরানে যুদ্ধবিরতির জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগই নয়, বরং এটি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল এবং ইরানের প্রভাব সীমিত করতে নতুন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থার সূচনাও হতে পারে। যদিও এই চারটি দেশ এর আগেও জোটবদ্ধভাবে আলোচনায় বসেছে, তবে সবশেষ বৈঠকটিকে কূটনীতিকরা একটি বিশেষ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা হিসেবে দেখছেন। ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয়বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন ফারুকের মতে, দিন দিন জটিল হতে থাকা এই বিরোধের জালে জড়িয়ে পড়া পক্ষগুলোকে উত্তেজনা প্রশমন ও যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোই এই গোষ্ঠীর প্রাথমিক লক্ষ্য। এই বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের এই পর্যায়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় এই চার দেশীয় গোষ্ঠীটি বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে ইসরায়েল আঘাত করেছে এবং সেখানে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে; এটি একটি দুঃস্বপ্ন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি লবণাক্ত পানি শোধনকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং উপসাগরীয় জলসীমায় কোনো পারমাণবিক বিকিরণ ঘটে, তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভেতরে একটি জাতীয় সংকটে রূপ নেবে।
ইসলামাবাদের বৈঠকে বেশ কিছু অগ্রগতিও লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন অন্তত দুটি করে পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে ইরান। একে একটি ছোট কিন্তু কার্যকর ‘আস্থা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে এটিও নির্ধারিত হয়েছে যে, এই গোষ্ঠীটি ইরানের সঙ্গে প্রধান আলোচক হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পথ খোলা রাখা সম্ভব হবে। ইরান অবশ্য মনে করে, এটিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। তেহরানের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার যে কথা বলছেন, তা তেলের দাম কমানোর জন্য একটি সাজানো গল্প মাত্র। রবিবারের বৈঠকের পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বেইজিংকে এই সংকটের বিষয়ে অবহিত করতে চীন সফরে যান। ইরানের ভেতর থেকে গুঞ্জন উঠেছে যে, যেকোনো চুক্তির গ্যারান্টার হিসেবে চীনকে একটি ভূমিকায় রাখতে হবে। তবে এই জোটের সদস্যপদ কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব যারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানকে ‘শেষ করার’ জন্য তাগিদ দিচ্ছে বলে বারবার খবর প্রকাশিত হয়েছে তারাও এই জোটের সক্রিয় সদস্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সৌদিরা অন্তত তাদের সব বিকল্প পথ খোলা রাখছে। ইয়াসমিন ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সব বিকল্পই বেশ ব্যয়বহুল। তারা চায় তাদের ওপর হামলার জন্য এবং হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে রাখার জন্য ইরানকে মাশুল দিতে হোক। অন্যদিকে, তারা এটিও নিশ্চিত হতে পারছে না যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে এই কাজ শেষ করতে পারবে কি না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং গোয়েন্দা সংস্থাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বোঝার এবং ইসরায়েলের শক্তিশালী হয়ে ওঠার ঝুঁকিগুলো উপলব্ধির আহ্বান জানিয়েছেন। কালিন বলেন, এই যুদ্ধ শুধু ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা নয়, বরং এখানকার প্রধান জাতিগোষ্ঠী তুর্কি, কুর্দি, আরব এবং পার্সিয়ানদের মধ্যে কয়েক দশকব্যাপী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করা। তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা অগ্রহণযোগ্য, কিন্তু আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে কারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে। ফিদানের দাবি, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা, যাতে তারা ইরানবিরোধী জোটকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।