বোকা বানানোর চিরন্তন আনন্দ

জীবনের সব গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে মাঝে মধ্যে একটু হাসাহাসি করা বা নিজেকে একটু বোকা হিসেবে মেনে নেওয়াও এক ধরনের সাহসিকতা। এপ্রিল ফুলস ডে নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

প্রতি বছর এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি বিশ্ব জুড়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনায় ভরে ওঠে। বন্ধু, পরিবার কিংবা সহকর্মীদের মধ্যে চলে একে অপরকে বোকা বানানোর এক নিরন্তর প্রতিযোগিতা। কারও পিঠে চুপিচুপি কাগজের মাছ লাগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত অবিশ^াস্য কোনো খবর সবকিছুর মূল লক্ষ্য একটাই আর তা হলো নির্ভেজাল আনন্দ। কখনো ছোট্ট একটি নিরীহ কৌতুক, আবার কখনো সুপরিকল্পিত বড়সড় প্র্যাঙ্ক সবকিছু মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে হাসি-ঠাট্টা আর চমকের এক অনন্য সমাহার।

সাধারণত গম্ভীর বা নিয়মমাফিক জীবনযাপন করা মানুষও এই দিনে হয়ে ওঠে দুষ্টুমিতে ভরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই উন্মাদনা আরও বিস্তৃত হয়েছে; এখন একটি মজার প্র্যাঙ্ক মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

ইতিহাসে এপ্রিল ফুলস

এপ্রিল ফুল পালনের সঠিক উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও মতভেদ রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো একক ব্যাখ্যা না থাকলেও, বিভিন্ন তত্ত্ব ও ঐতিহাসিক ঘটনার সমন্বয়ে এই দিনের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় ধারণাটি আমাদের নিয়ে যায় ষোলোশ শতকের ফ্রান্সে।

১৫৮২ সালে ফ্রান্সে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অ্যাডপশন বা নতুন বর্ষপঞ্জি গ্রহণ কার্যকর করা হয়, যার মাধ্যমে পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে নতুন পদ্ধতিতে বছরের হিসাব শুরু হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ফরাসি রাজা নবম চার্লসের। নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন নির্ধারিত হয় পহেলা জানুয়ারি, যা পূর্বে অনেক অঞ্চলে মার্চের শেষ বা এপ্রিলের শুরুর দিকে উদযাপিত হতো।

কিন্তু সেই সময়ের সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই পরিবর্তনের খবর দ্রুত সবার কাছে পৌঁছায়নি। গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ পুরনো নিয়মেই এপ্রিলের শুরুতে নববর্ষ উদযাপন করতে থাকেন। আবার কেউ কেউ নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানলেও, ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত থেকে পুরনো প্রথা ছাড়তে চাননি। এই দুই ধরনের মানুষই ধীরে ধীরে বিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উপহাস রূপ নেয় এক ধরনের সামাজিক খেলায়। যারা এপ্রিল মাসে নববর্ষ উদযাপন করতেন, তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো ভুয়া আমন্ত্রণপত্র, অদ্ভুত উপহার কিংবা মিথ্যা সংবাদ। কখনো তাদের এমন কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো, যার আসলে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আবার কখনো এমন উপহার দেওয়া হতো, যার কোনো বাস্তব ব্যবহার নেই শুধু বিভ্রান্ত করার জন্যই তৈরি।

ফ্রান্সে এই প্রথাটি আরও একটি মজার রূপ নেয়, যেখানে মানুষ একে অপরের পিঠে কাগজের মাছ লাগিয়ে দিত যা পরবর্তী সময় পয়সন দ্য এভ্রিল বা এপ্রিল ফিশ নামে পরিচিত হয়। ধারণা করা হয়, মাছ সহজেই ধরা পড়ে ঠিক তেমনি এই মানুষগুলোকেও সহজেই বোকা বানানো যেত বলেই এই প্রতীকটি ব্যবহার করা হতো।

তবে ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ এই তত্ত্বের বাইরেও অন্যান্য সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন প্রাচীন রোমান উৎসব হিলারিয়ার সময় মানুষ ছদ্মবেশ ধারণ করে একে অপরকে ধোঁকা দিত অথবা মধ্যযুগীয় ইউরোপের বসন্ত উৎসবগুলোতেও এমন কৌতুকপূর্ণ আচরণের প্রচলন ছিল। এসব ঐতিহ্যের সম্মিলনেও এপ্রিল ফুলের ধারণা গড়ে উঠতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

ফ্রান্সে এপ্রিল ফিশ

ফ্রান্সে এপ্রিল মাসের এই প্রথম দিনটি একটি বিশেষ নামে পরিচিত, যাকে বলা হয় পয়সন দ্য এভ্রিল বা এপ্রিল ফিশ। এই নামকরণের পেছনে একটি মজার যুক্তি রয়েছে। বসন্তের এই সময়ে মাছেরা খুব সহজেই জালে ধরা দেয়, অর্থাৎ তাদের খুব সহজেই বোকা বানানো যায়। এই ধারণা থেকেই ফ্রান্সে প্র্যাঙ্ক বা কৌতুকের প্রতীক হিসেবে মাছকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সেখানে ছোট ছেলেমেয়েরা বা বড়রা একে অপরের অলক্ষ্যে পিঠে কাগজের তৈরি মাছের ছবি আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেয়। যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি বুঝতে পারছেন যে, তার পিঠে মাছ ঝুলে আছে, ততক্ষণ সবাই তাকে দেখে আনন্দ পায়। যখন তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেন, তখন সবাই চিৎকার করে বলে ওঠে এপ্রিল ফিশ। এই সরল কৌতুকটি ফ্রান্সের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আজও অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে পালন করা হয়।

সেরা টেলিভিশন প্র্যাঙ্ক

টেলিভিশন বা গণমাধ্যম যখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নিল, তখন এপ্রিল ফুলের কৌতুক এক নতুন মাত্রা পেল। উনিশশ সাতান্ন সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি একটি তথ্যচিত্র প্রচার করে যেখানে দেখানো হয় সুইজারল্যান্ডের একটি পরিবার তাদের বাগানের গাছ থেকে লম্বা লম্বা স্প্যাগেটি সংগ্রহ করছে। সেই সময়ে স্প্যাগেটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত খাবার ছিল না। সংবাদ উপস্থাপক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দাবি করেন যে, সেই বছর শীতকাল খুব নরম হওয়ায় স্প্যাগেটির ফলন খুব ভালো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এই খবর বিশ্বাস করে বিবিসিতে ফোন করতে শুরু করেন। তারা জানতে চেয়েছিলেন কীভাবে নিজেদের বাগানেও এই স্প্যাগেটি গাছ লাগানো সম্ভব। বিবিসি অত্যন্ত কৌতুক করে উত্তর দিয়েছিল যে, একটি স্প্যাগেটি টমেটো সসের টিনে রেখে দিলেই নাকি গাছ হবে। এটি আজও ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং সফল প্র্যাঙ্ক হিসেবে স্বীকৃত।

উড়ন্ত পেঙ্গুইন

২০০৮ সালে বিবিসি আবারও একটি অবিশ্বাস্য ভিডিও প্রকাশ করে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এন্টার্কটিকার একদল পেঙ্গুইন হঠাৎ করে ডানা মেলে আকাশে উড়ে যাচ্ছে এবং তারা শীত থেকে বাঁচতে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। ভিডিওর বর্ণনা এবং দৃশ্যগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে, বহু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ এটি বিশ্বাস করে বসেন। তারা ভেবেছিলেন হয়তো বিবর্তনের ফলে পেঙ্গুইনরা ওড়ার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। পরে জানা যায়, এটি ছিল উন্নত গ্রাফিক্স এবং অ্যানিমেশনের কাজ। এই প্র্যাঙ্কটি দেখিয়েছে যে, প্রযুক্তির সাহায্যে কত সহজে মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। যদিও এটি একটি কৌতুক ছিল, তবুও পেঙ্গুইনদের সেই ওড়ার দৃশ্যটি মানুষের মনে দীর্ঘকাল দাগ কেটেছিল।

বামহাতিদের জন্য বার্গার

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও এপ্রিল ফুলকে তাদের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। ১৯৭৮ সালে বিখ্যাত ফাস্ট ফুড চেইন বার্গার কিং আমেরিকার প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দেয়। সেখানে তারা দাবি করে, তারা বিশেষ করে বাহাতি গ্রাহকদের জন্য লেফট হ্যান্ডেড হুপার বা বামহাতি বার্গার তৈরি করেছে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, এই বার্গারের ভেতরের উপাদানগুলো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে সাজানো হয়েছে, যাতে বামহাতিদের খেতে সুবিধা হয়। পরের দিন হাজার হাজার মানুষ বার্গার কিংয়ের দোকানে গিয়ে এই বিশেষ বার্গারের অর্ডার দিতে থাকেন। এমনকি অনেকে ডানহাতি বার্গারটির জন্যও আলাদা করে অনুরোধ করতে শুরু করেন। পরে যখন তারা জানতে পারেন, এটি একটি কৌতুক ছিল, তখন সবাই হাসিতে ফেটে পড়েন। এটি ছিল বিপণন জগতের এক অনন্য উদাহরণ।

লন্ডনের আকাশে ভিনগ্রহী যান

১৯৭৮ সালের ৩১ মার্চ রাতে লন্ডনের উপকণ্ঠে মানুষ এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আকাশে একটি উজ্জ্বল এবং অদ্ভুত আকৃতির যান উড়তে দেখা যায়, যা দেখে সবাই ভেবেছিলেন

পৃথিবী হয়তো ভিনগ্রহী প্রাণীদের আক্রমণের শিকার হতে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পুলিশকে ফোন করতে থাকেন। যখন সেই যানটি মাটিতে অবতরণ করে এবং ভেতর থেকে রুপালি পোশাক পরা একজন মানুষ বেরিয়ে আসে, তখন পুলিশ সদস্যরাও ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানা যায় এটি ছিল ভার্জিন আটলান্টিক কোম্পানির মালিক রিচার্ড ব্র্যানসনের একটি সুপরিকল্পিত প্র্যাঙ্ক। তিনি একটি হট এয়ার বেলুনকে ভিনগ্রহী যানের মতো সাজিয়েছিলেন। মূলত পহেলা এপ্রিল সকালে এটি হওয়ার কথা থাকলেও বাতাসের কারণে আগের রাতেই তিনি এটি উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

বোকামির পেছনে অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব

কেন মানুষ একে অপরকে বোকা বানাতে এত পছন্দ করে, তার পেছনে একটি গভীর মনস্তত্ত্ব কাজ করে। আমরা আসলে মাঝে মাঝে অবাক হতে ভালোবাসি। প্রতিদিনের কঠোর নিয়ম আর একঘেয়েমি জীবনের বাইরে গিয়ে একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা আমাদের স্নায়ুকে সতেজ করে। বোকামি করার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভেতরকার শিশুটিকে জাগিয়ে তুলি। এ ছাড়া হাসির মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও সহজ এবং ঘনিষ্ঠ হয়। অন্যের ওপর ক্ষতিকর কোনো প্রভাব না ফেলে যখন আমরা কোনো কৌতুক করি, তখন সেটি এক ধরনের সামাজিক বন্ধন তৈরি করে। এপ্রিল ফুল আমাদের শেখায় যে সবকিছুকে সবসময় খুব গুরুত্বের সঙ্গে বা সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাঝে মাঝে একটু বোকামি করা বা বোকা হওয়া আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

হাসির জয়গান

সব কৌতুকই যে আনন্দদায়ক হবে, এমন কোনো কথা নেই। এপ্রিল ফুলের নামে অনেক সময় এমন কিছু করা হয়, যা অন্যের মনে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভুল তথ্য ছড়ানো, কাউকে ভয় দেখানো বা কারও শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে এমন প্র্যাঙ্ক কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। একটি ভালো কৌতুক বা প্র্যাঙ্কের শেষ পরিণতি হওয়া উচিত হাসি, লজ্জা বা ভয় নয়। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যেখানে ভুয়া খবর বা ফেইক নিউজ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে এপ্রিল ফুলের নাম করে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। হাস্যরসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। তাই মজা করার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের আনন্দের কারণে যেন অন্য কেউ বিপদে না পড়ে।

একে অপরকে নির্দোষ কৌতুকের মাধ্যমে বোকা বানানোর এই ঐতিহ্য শত শত বছর ধরে টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত আনন্দপ্রিয় প্রাণী। তাই পহেলা এপ্রিল আসলে আমরা যেন কেবল প্রতারণাকেই না দেখি, বরং এর পেছনের সেই অমলিন হাসি আর বন্ধুত্বের পরশটুকুকেও অনুভব করি। দিন শেষে পৃথিবীটা হাসির কারণেই সুন্দর।