হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে বাধা নেই

ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে পার হওয়ার জন্য অনুমতি দেবে। এই জলপথ দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের কোনো সমস্যা নেই। ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে ইরান দূতাবাস আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ সরকার ছয়টি জাহাজের ব্যাপারে ইরান সরকারকে জানায় এবং হরমুজ প্রণালি পার হতে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। জাহাজগুলো সম্পর্কে ইরান সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আগে না দেওয়ায় শনাক্ত করা যায়নি।

জলিল রহিমি জানান, জাহাজগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ইরান গত সপ্তাহে পেয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জাহাজগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছে। এটা নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে ইরান সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশে জ্বালানি-সংকট ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি ইরান লক্ষ করছে। ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেন জ্বালানি-সংকটে না পড়ে, ইরান সে দিকে নজর রাখছে। সেই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল ইরান অব্যাহত রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আগ্রাসন শুরু করায় ইরান পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থতি হরমুজ প্রণালি হয়ে ‘অনুমতি ছাড়া’ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। আরব নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরে বর্তমানে প্রায় ৮০০ জাহাজ আটকে আছে। 

রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানে আটকে পড়া ১৮০ বাংলাদেশি এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন। আরও যারা সেখানে আছেন, তারা আসতে চাইলে ইরান সহযোগিতা করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে এবারকার যুদ্ধ ইরান শুরু করেনি, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই যুদ্ধ শুরু করেছে। তবে যুদ্ধের এক মাস যেতে না যেতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পালাবার পথ খুঁজছেন।

ট্রাম্প জায়নবাদী ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিয়েছেন, এমন দাবি করে রাষ্ট্রদূত বলেন, যক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সকালে এক কথা, দুপুরে অন্য কথা এবং রাতে আরেক কথা বলেন।

জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এবার যুদ্ধ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার যে বিবৃতি দিয়েছে, তা নিয়ে ইরান সরকার সন্তুষ্ট নয়।

যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরান প্রত্যাশা করে মুসলাম-প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আগ্রাসী শক্তির ভূমিকার নিন্দা করবে। রাষ্ট্রদূত জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

হরমুজে জ্বালানির জাহাজ ছাড়ে সারেও আশা

এদিকে নতুন এই পদক্ষেপের মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে সরকার যে শঙ্কায় পড়েছিল, সেখান থেকে উত্তরণের আশা দেখছে। এই বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু বিকল্প উৎসই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও সার আমদানির জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। এই চেষ্টায় নতুন সম্ভাবনা জাগিয়েছে জ্বালানির জাহাজ ছাড়ে। আমরা আশা করছি, জ্বালানির জাহাজ যেহেতু আসছে, সেহেতু আমরা সারের জাহাজও আনতে পারব।’

মন্ত্রী বলেন, আরব আমিরাতের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি রয়েছে। তারা জানিয়েছে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশকে ৩ লাখ টন সার সরবরাহ করবে। তবে এর জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতিসহ যত প্রক্রিয়া সেটা বাংলাদেশকে সামলাতে হবে। এজন্য কাজও শুরু হয়েছে। এখন সার আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের আশা আরও বেড়ে গেল।

জানা গেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ১ লাখ টন করে দুটি দরপত্র আহ্বান করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানের উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেছে। এই সিদ্ধান্ত আগেভাগেই নেওয়া হচ্ছে, যাতে করে সংকটে পড়তে না হয়। নতুন আরও ২ লাখ টনের দরপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বিসিআইসি সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত থেকে সার আমদানি করে বাংলাদেশ। একদিকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সমস্যা, অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি। প্রায় সাড়ে ৪০০ ডলারে বিক্রি হওয়া ইউরিয়া এখন প্রায় ৮০০ ডলার ছুঁয়েছে। হু হু করে বাড়ছে টিএসপি ও ডিএপির দাম। কাতার ও আমিরাত থেকে শুধু ইউরিয়া এবং সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আনা হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎসগুলো থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির জন্য ব্যাপক যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার। বিকল্প দেশের তালিকায় রয়েছে, চীন, মিসর, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ। কারণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে রাশিয়া এখন বৈশি^ক বড় সরবরাহকারির তালিকায় উঠে এসেছে।

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, চীনের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে। আবার রাশিয়া থেকেও সার আসবে। কারণ রাশিয়ার সার আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। এমন সময় বাংলাদেশ চায়না থেকে সার আনার চেষ্টা করছে যখন কি না দেশটি রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।