ইসরায়েলি ফাঁসির আইনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে ফুঁসছে জনতা

ফিলিস্তিনিদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার লক্ষ্যে ইসরায়েলের নতুন বিতর্কিত আইনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম। এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে বুধবার ফিলিস্তিনিরা রাজপথে নেমে আসার পাশাপাশি সর্বাত্মক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ পালন করেছেন। 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের রাজনৈতিক দল ফাতাহ্ এই সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটের ফলে পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ, হেব্রন ও নাবলুসসহ প্রধান শহরগুলোর দোকানপাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

বুধবার রামাল্লাহ শহরে শত শত ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মদদপুষ্ট এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই আইন বাতিলে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। নাবলুস শহরে বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘দেরি হওয়ার আগেই বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন বন্ধ করো।’ একটি প্ল্যাকার্ডে কেফিয়াহ পরিহিত একজন ফিলিস্তিনি বন্দির পাশে ফাঁসির দড়ির ছবি দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

সংবাদ সংস্থা এএফপি জানায়, দুপুরে হেব্রন ও রামাল্লাহর অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ দেখা গেছে। জেরুজালেমের উত্তর-পূর্বে আনাতা শহরে ধর্মঘট পালনকারী দোকানদারদের জোরপূর্বক দোকান খুলতে বাধ্য করেছে ইসরায়েলি সেনারা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এই আইনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘অধিকৃত অঞ্চলের বাসিন্দাদের ওপর এই আইনের প্রয়োগ হবে একটি যুদ্ধাপরাধ।’

নতুন এই আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক আদালতে ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে ডিফল্ট সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। উল্লেখ্য, অধিকৃত এলাকার ফিলিস্তিনিদের বিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে হয়, যা কার্যত একটি পৃথক ও কঠোর বিচারিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি বেসামরিক আদালতে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্তদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড—উভয় বিকল্পই রাখা হয়েছে।

রামাল্লাহর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৫৩ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানী রিমান বলেন, ‘এখানে এমন কেউ নেই যার ভাই, স্বামী, সন্তান বা প্রতিবেশী ইসরায়েলি কারাগারে নেই। প্রতিটি ফিলিস্তিনি পরিবারেই কেউ না কেউ বন্দি।’

বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারে ৩৫০ জন শিশু এবং ৭৩ জন নারীসহ ৯ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, বন্দিরা নির্যাতন, অনাহার এবং চিকিৎসা অবহেলার শিকার হচ্ছেন, যার ফলে ইতিমধ্যে কয়েক ডজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, কালান্দিয়া চেকপয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট, স্টান গ্রেনেড এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তবে এতে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। 

১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতার মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

সূত্র: আল-জাজিরা