দায়িত্বশীলদের জন্য সতর্কবার্তা

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো দায়িত্বের ভার বহন করছে। দায়িত্ব মানুষকে মর্যাদার আসনে বসাতে পারে, আবার অবহেলার কারণে তা তাকে লাঞ্ছিতও করতে পারে। তাই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এবং সেটা যথাযথভাবে পালন করা অপরিহার্য। সাধারণত দায়িত্ব মানুষকে দুনিয়ায় ক্ষমতাসীন এবং পরকালে ধরাশায়ী করে, যখন তা যথার্থভাবে পালন করা না হয়। মোটা দাগে দায়িত্বের রয়েছে এই দুটি বড় কার্যকারিতা। দায়িত্ব মানুষকে ধরাশায়ী করে, কারণ দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত আছে জবাবদিহি। আবার জবাবদিহির প্রকরণ দুটি। মানুষের কাছে জবাবদিহি এবং মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি। মানুষের কাছে জবাবদিহির প্রবণতা কমে গেলে বা বিলুপ্ত হলে মানুষ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়ে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি হারিয়ে গেলে।

দায়িত্বশীলরা মানুষের কাছে জবাবদিহি না করলেও মৃত্যুপরবর্তী জীবনে বা পরকালে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তখন মহান আল্লাহর কাছে চরমভাবে ধরাশায়ী হতে হবে। সেদিন তাদের হাত, পা, চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তাদের মন্দ দশা তারা সেদিন নিজ চোখে দেখতে পারবে। সেদিন তাদের আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। তাই দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্ক থাকা কাম্য। নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রকৃত মুমিনের গুণ। মুমিন তার নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। সে এই বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে, তাকে পরকালে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মনে রেখো, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মনিবের সম্পদের ওপর দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারি)

জবাবদিহি হ্রাস পেলে মানবজীবনে নানা ধরনের অধঃপতন নেমে আসে। তাই মানুষকে জবাবদিহির শিক্ষা অনুধাবন করানোর কোনো বিকল্প নেই। মানুষকে এভাবে বোঝানো ও বিশ্বাস করানো উচিত যে, মহান আল্লাহ সবকিছু দেখছেন, তিনি আমাদের থেকে সবকিছুর হিসাব নেবেন। তাই অসৎ পথে চলা যাবে না, অসৎ কাজ করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে জমিন ও আসমানের কোনো কিছুই গোপন থাকে না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৫) তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের চোখের চোরা চাহনি এবং তাদের অন্তরে, যা কিছু লুকিয়ে থাকে, সবই তিনি জানেন।’ (সুরা গাফির, আয়াত ১৯) মানুষের ভেতর পরকালের ভয় জাগ্রত করতে পারলে আশা করা যায় যে, অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে। যদি প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সজাগ হয় এবং আখেরাতে জবাবদিহির অনুভূতি হৃদয়ে জাগরূক থাকে তাহলে সমাজের সিংহভাগ অভিযোগ ও সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

হজরত ওমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তার সম্পর্কে গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি এ রকম, হজরত ওমর (রা.) মৃত্যুর আগে তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, আমি মারা যাওয়ার পর কবরের হিসাব-নিকাশ শেষে যখন জান্নাতে যাব তখন স্বপ্নযোগে তোমার সঙ্গে দেখা করব। তিনি খলিফা নিযুক্ত হওয়ার ১০ বছর ২ মাস ১৩ দিন পর শাহাদাতবরণ করেন। তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি। তাই ওমর (রা.)-এর ওই বন্ধু ভেবেছিলেন, ওমর (রা.) ইন্তেকালের পরই সরাসরি জান্নাতে চলে যাবেন। এজন্য তিনি এটা ভেবে প্রতিদিন ঘুমাতে যেতেন যে, আজই ওমর (রা.)-কে স্বপ্নে দেখবেন। এভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় কিন্তু ওমর (রা.) স্বপ্নযোগে তার সঙ্গে দেখা করেন না। ওমর (রা.) ইন্তেকালের ঠিক ১০ বছর ২ মাস ১৩ দিন পর তার ওই বন্ধুর সঙ্গে স্বপ্নযোগে দেখা করেন। সেদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন ওমর (রা.)-এর চেহারা ঘর্মাক্ত হয়ে আছে। তিনি বললেন, হে ওমর! তোমার এমন অবস্থা কেন এবং স্বপ্নে তুমি এতদিন পর দেখা দিলে কেন? ওমর (রা.) বললেন, আমি ১০ বছর ২ মাস ১৩ দিন শাসকের দায়িত্ব পালন করেছি। আমার এই ১০ বছর ২ মাস ১৩ দিনের হিসাব দিতে সময় লেগেছে ১০ বছর ২ মাস ১৩ দিন। দুনিয়াতে শাসকের দায়িত্ব পালন করা যতটা কঠিন তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়া। তাই আমাকে এমন ঘর্মাক্ত দেখতে পাচ্ছ।

হজরত ওমর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। কেয়ামতের দিন সৎকাজের ওজনের পাল্লা হালকা হওয়ার ভয়ে তিনি খেলাফতকালে এক প্রকার নির্ঘুম থাকতেন। তিনি বলতেন, যদি আমি রাতে ঘুমাই, তাহলে আমি নিজেকে ধ্বংস করলাম। আর যদি দিনে ঘুমাই, তাহলে প্রজাদের শেষ করলাম। কেননা আমি তাদের ওপর দায়িত্বশীল। তিনি আরও বলতেন, যদি ফোরাতের তীরে একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায় তবে ওমর সে জন্য দায়ী থাকবে। হজরত ওমর (রা.) কেমন শাসক ছিলেন, ভাবা যায়! তার মতো ন্যায়পরায়ণ শাসকের শাসনকালের প্রতি একদিনের হিসাব দিতে যদি একদিন লাগে, তাহলে ওমর (রা.) বা খেলাফতে রাশেদার খলিফাদের পর পৃথিবীর আর কোনো শাসক আছেন, যিনি মহান আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে পারবেন? কেউ পারবেন না। সম্ভবই নয়!  প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি, আমরা প্রতিনিয়ত কী করছি? আমাদের পরবর্তী জীবনের জন্য আমরা কী সংগ্রহ করছি? এসব চিন্তা সবারই করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব নেবেন। তাই নিজেকে পরকালের জন্য সেভাবে প্রস্তুত করা কাম্য।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

muftimahbub503@gmail.com