আমাদের দেশে ইংরেজি পরীক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নপত্র, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বিসিএস এবং কোনো নিয়োগ পরীক্ষার (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রশ্নপত্র দেখলে কী মনে হয়? প্রশ্নের সঙ্গে ইংরেজি পড়া বা ইংরেজি বিষয়টিকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পড়ানোর উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ইংরেজি প্রশ্ন দেখলে মনে হয়, শিক্ষার্থী কিংবা বিসিএস পরীক্ষার্থী অথবা কোনো নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জানতে চান যে, শিক্ষার্থী বা কোনো প্রার্থী ইংরেজি ভাষার গঠন প্রণালি বা ব্যাকরণ নিয়ে গভীর গবেষণা করছেন কি না? আমাদের দরকার ছিল, তারা ইংরেজিতে নিজ সম্পর্কে, চারপাশ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে কি না এবং সেই বিষয়গুলো ইংরেজিতে লিখতে পারছেন কি না? অন্যের ইংরেজি বলা বুঝতে পারেন কি না এবং সেই অনুযায়ী উত্তর দিতে পারে কি না? সেটি নিশ্চিত করার জন্য, ক্লাস ও পরীক্ষা সে ধরনের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি, তারা সবাই এমন সব বিষয় প্রশ্নে তুলে দেন বা জিজ্ঞেস করেন যার দ্বারা বোঝা যায় যে, শিক্ষার্থী বা প্রার্থী ইংরেজি গ্রামারে এমফিল করছে কি না কিংবা পিএইচডি করছে কি না। আমি পাবলিক পরীক্ষার কয়েকটি প্রশ্ন এবং ক্যাডেট কলেজের প্রশ্ন দেখলাম। দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবেন, এখানে কী ধরনের টেস্ট করতে চাওয়া হয়েছে?
এই অবস্থা শিক্ষার্থীদের ভাষা ব্যবহার, ব্যবহার করার অনুশীলনকে যে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যে উদ্দেশ্যে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যের ধারেকাছে নেই। প্রশ্নপত্র এমনভাবে হয় যে, মনে হয়, একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ভালোভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছে। সেটি ইতিমধ্যে পরীক্ষিত এবং এখন ভাষায় তার কতটা গভীর দখল আছে, সেটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব করতে গিয়ে, শিক্ষার্থীর ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা মোটেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ভাষা নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা হয়তো এসব বিষয় কারণ ও সম্পর্ক বের করে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। যাতে আরও যারা এসব বিষয় গবেষণা করতে চান তারা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ ইংরেজি শিক্ষকের সামাজিক জীবনে সেটি তেমন কোনো কাজে আসে না। লাখো কোটি শিক্ষার্থীর এই নিয়ে কোনো কাজ নেই, এতে তাদের কোনো উপকারও হয় না। আর এ জন্যই রাষ্ট্রীয় খরচে যে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে, তাতে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। যদিও কারিকুলামে লেখা আছে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিষয়ে নিজেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতে পারবে, ইংরেজি শুনে বুঝতে পারবে, ইংরেজি নিজে লিখতে পারবে এবং ইংরেজি বিষয় পড়ে বুঝতে পারবে এবং ভেতরকার মেসেজ গ্রহণ করতে পারবে। জাতীয়ভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্য এবং তারা কী অর্জন করবে, তার সঙ্গে প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থা কোনোভাবে যায় না। ইংরেজি একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়, মূলত বাণিজ্যিক কারণে। কিন্তু প্রশ্নপত্র, পড়ানোর ধরন এবং সবার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, বাঙালিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাদ দিয়ে যেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সবার গবেষণা করতে বসেছেন এবং এর কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়গুলো আয়ত্ত তাদের করতেই হবে, তবেই না ইংরেজি শেখা হয়ে যাবে!
শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি জানতে হবে, যাতে তারা বিদেশে চাকরি কিংবা উচচশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে বিপদে না পড়েন। সুন্দরভাবে তাদের কাজগুলো ভিন্নভাষী দেশে চালিয়ে যেতে পারেন। দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী, মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করেন। তারা না জানেন ইংরেজি, না জানেন আরবি। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শুনে শুনে আরবি ভাষা, তাদের মধ্যে অনেকে আয়ত্ত করে ফেলেন এবং চমৎকারভাবে আরবি ভাষায় কথা বলেন। তারা যদি ইংরেজি ভাষাটিও অনেকটা আয়ত্ত করতে পারতেন, তাহলে সেটি হতো সোনায় সোহাগা। কারণ তারা শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, আরও বেশি বেতনের কাজ করতে পারতেন। আর কাজ করে অর্থ উপার্জন মানে, শুধু তার নিজের উপার্জন নয় দেশের উপার্জন। কিন্তু বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে রূপ দিতে পারছি না। কারণ শিক্ষাজীবনে তাদের শিখিয়েছি, নাউন কত প্রকার ও কী কী, কোনটি কোন ধরনের নাউন এবং কেন ইত্যাদি। যা মরুভূমির দেশ কিংবা শীতপ্রধান দেশ, কোথাও তেমন কাজে লাগছে না। ফলে আবার অতিরিক্ত পয়সা ও সময় ব্যয় করে তারা বিভিন্ন ধরনের কোচিংয়ে ভর্তি হন ইংরেজি শেখার জন্য। কিন্তু সেই কোচিংগুলোর অবস্থাও তো একই তারা শেখাচ্ছেন কিছু অনুবাদ, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাষা ব্যবহারের কোনো অনুশীলন নেই। যারা উচ্চশিক্ষা কিংবা অন্য কোনো কাজের জন্য বিদেশে যান, তারা যাতে ভালোভাবে ইংরেজি ভাষাভাষী কিংবা অন্য ভাষাভাষী দেশে সব কাজ মোটামুটি ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। আমাদের ইংরেজি পড়ানো, ক্লাস, সিলেবাস ও মূল্যায়ন, সে রকম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সবাই সারা জীবন ভাব কত প্রকার, কোন শব্দটি একটি বাক্যে কোন ধরনের নাউন এবং কেন এবং এগুলো পড়েছেন সব বাংলায় ব্যাখ্যা অর্থাৎ ভাষা শেখার কোনো পদ্ধতিতে নয়। জটিল বাক্য কাকে বলে, ও কেন বলে, গঠন প্রণালি কী কী ইত্যাদি। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলেই তো বোঝা যাচ্ছে, প্রায় সবকিছুই এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর লিখিত একটি অংশ থাকে, যা পুরোপুরি ট্রাডিশনাল। আর সেই সুযোগ কিছু শিক্ষক ও কোচিং সেন্টার একটি প্যারাগ্রাফ থেকে, কীভাবে অন্য কোনো প্যারাগ্রাফ লেখা যায় ইত্যাদি কসরত শেখায় শিক্ষার্থীদের। নিজের ভাষা উন্নত করার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। প্রশ্ন হলো, তাদের কি কেউ জিজ্ঞেস করবে কোন কোনটি অ্যাকটিভ ভয়েস, কোনটি নাউন বা অ্যাপোজিশন? তারা বরং দেখবেন, আমাদের শিক্ষার্থী বা গ্র্যাজুয়েটরা বিদেশিদের ইংরেজি বলা কতটা বোঝেন, সেভাবে উত্তর দিতে পারেন কি না, নিজেও তা বলে প্রকাশ করতে পারেন কি না এবং নিজে লিখে প্রকাশ করতে পারেন কি না। আর এ চারটি জায়গাতেই আমাদের শিক্ষার্থীরা কিংবা গ্র্যাজুয়েটরা প্রচুর দুর্বল। কারণ তারা সেভাবে পড়ে আসেননি এবং মূলত পড়ানো হয়নি। তারা সারাজীবন জেনেছেন, গ্রামারের খুঁটিনাটি। সেগুলো নিয়েই তাদের ইংরেজি শেখা, আলোচনা, ইংরেজি জানার অগ্রগতি মূল্যায়ন হয়েছে, যা বাস্তব জীবনে ইংরেজি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কহীন।
বিশ-ত্রিশ বছর আগে দেশে মাত্র কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। সেগুলোতে একটি করে ইংরেজি বিভাগ ছিল এবং প্রতিটি বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ৩০-১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। তাদের পড়ানো হতো শুধু ইংরেজি সাহিত্য। সেখানেও উদ্দেশ্য সঠিক ছিল না। তবে সাহিত্য যেহেতু ইংরেজিতে পড়তে হতো, তাই পড়ে পড়ে অনেকের ইংরেজিতে কিছুট দখল চলে আসত। কিন্তু ইংরেজি বলার ক্ষেত্রে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীর তা দখলে চলে আসত। আর বলে প্রকাশ করার বিষয়টি, তখন এতটা পরিষ্কার ধারণাও ছিল না। এখন অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে এবং প্রতিটিতেই সাহিত্য সেভাবে পড়ানো হয় না। কিন্তু পড়ানো হয় ল্যাংগুয়েজ। এখানেও শিক্ষার্থীদের যে ভাষা উন্নত করতে হবে, চারটি স্কিলকে ডেভেলপ করতে হবে, সেটিও অতটা স্পষ্ট নয়। যারা একটু স্মার্ট এবং খোঁজখবর রাখেন, তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী স্পিকিংকে ভালো গুরুত্ব দেন এবং নিজের স্কিলটা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করেন। লেখার স্কিল বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তারা মোটামুটি ভালো চাকরিও ম্যানেজ করেন। এখানকার শিক্ষকরা নিজেদের প্রোফাইল বাড়ানোর জন্য, চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য, বিদেশে স্কলারশিপের জন্য কিছু কিছু বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন। সেটি একদিকে ভালো যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে তারা অনেকটা এগিয়ে থাকেন এবং পড়াশোনা করার চেষ্টা করেন। সেই বিষয়গুলো কিন্তু দেশের বিশাল বহরের শিক্ষার্থী যারা বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ছেন, তাদের ব্যক্তি পর্যায় বা কাজে ব্যবহার করার বিষয়কে স্পর্শ করে না। অর্থাৎ এসব শিক্ষকরা যেসব নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ইত্যাদি করেন, তা সাধারণ শিক্ষার্থী মোট কথা বিশাল সংখ্যার শিক্ষার্থীদের তেমন কাজে লাগে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে যে, বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে তার সঙ্গে পুস্তক, কারিকুলাম, পরীক্ষা, শ্রেণি কার্যক্রম এবং বিশাল বহরের শিক্ষক পালন করা হচ্ছে। এসব মূল উদ্দেশ্যের ধারে কাছে না হওয়ায়, বলা যায় সরকারি প্রজেক্ট অনেকটাই অকার্যকর। কারণ ব্যতিক্রম দু-চারজন শিক্ষার্থী ছাড়া, কেউ-ই কিন্তু ইংরেজি কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারছেন না। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মনে করে, ইংরেজিতে পাস করতে পারলেই হলো, তা সে যেভাবেই হোক। আর এই পাসের ব্যাপারটি অত্যন্ত সহানুভূতি আর ছাড় দেওয়ার মধ্যে আটকে আছে। প্রশ্ন, মূল্যায়ন, মার্কিং ও সার্টিফিকেট সবই ছাড় দেওয়ার মধ্যে চলছে। সবশেষে বলতে চাই, সেদিন ঢাকায় এক বেসরকারি কলেজের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলছিলাম, যার কলেজে ইংরেজিতে অনার্স পড়ানো হয়। বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনার মাধ্যমে জানার চেষ্টা করলাম ইংরেজিতে যেসব শিক্ষার্থীরা অনার্স ও মাস্টার্স পড়ছে তাদের পড়াশোনার ধরন, জানার ব্যাপ্তি, ইংরেজি ব্যবহার এবং সর্বোপরি ফলাফল কেমন হয়। উত্তরে, তিনি বললেন তাদের ফুল গ্রেডিং দেওয়া হয় অর্থাৎ আগের যুগে যে ফার্স্ট ক্লাস সে ধরনের উন্নতমানের ফার্স্ট ক্লাস পায় সবাই, কেউ দ্বিতীয় শ্রেণি পায় না। বললাম সেটি কেমন, সবাই এত ভালো? উনি বললেন, তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য এমনটি করা হয় যারা ক্লাস করে না, টিউটরিয়াল পরীক্ষা ঠিকমতো দেয় না তাদেরসহ সবাইকে প্রথম শ্রেণি পাইয়ে দিতে হয়, যাতে তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না পারে। সবশেষে যখন বললাম, তাদের জানাশোনর ব্যাপ্তি কতটা বাড়ে? অধ্যাপক বললেন, ওরা এসএসসিতে ইংরেজির যে জ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়, এখান থাকে অনার্স বা মাস্টার্স পাস করার পর সেই জ্ঞান বা দক্ষতা থেকে সম্ভবত একটুও অগ্রসর হয় না। কারণ ক্লাস বা বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব কম। তাদের খাতা দেখে মার্কস দেওয়া যায় না বা দেখা হয় না। খাতা না পড়ে এবং অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে নম্বর দেওয়া হয়। এই হচ্ছে আমাদের ইংরেজি শিক্ষার হাল। অনেকে ইংরেজি পড়া, স্পিকিং করাতে বসে গেছেন গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী শহরের সর্বত্র। কেউ পড়াচ্ছেন ইংরেজিতে কিছু স্ট্রাকচার, কিছু ট্রান্সলেশন, কেউ কিছু ডায়ালগ। সবার ধারণা, ইংরেজি ভাষা বোধহয় এভাবেই শেখানো হয়। উদ্দেশ্য এবং পড়ানোর ধরন নিয়ে সবাই ধন্দের মধ্যে। এটিই দেশে ইংরেজি শেখানোর বাস্তবতা।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক প্রেসিডেন্ট : ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
masumbillah65@gmail.com