রেমিট্যান্সযোদ্ধার ভোগান্তি

রেমিট্যান্সযোদ্ধারা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রাণভোমরা। এটাই আসল সত্য। আবার এই সত্যের পেছনে লুকিয়ে আছে বেদনা আর কান্নার দীর্ঘকালের প্রতারণা, মিথ্যা আশ্বাস, ভুয়া ভিসা, ফ্রি ভিসা, ভিজিট ভিসা এবং বৈধ ভিসায় বিদেশে যাওয়া। এরপর প্রতারিত হয়ে সামান্য বেতনে চাকরি ও অবহেলা এবং বঞ্চনা তাদের ভাগ্যে জুটেছে। বিশেষ করে, গ্রামগঞ্জের সরল শ্রমজীবীদের প্রতারণা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর সেটা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে। সেখানে তারা ভালো কাজ ও বেতনের কথা বললেও, আসলে মিথ্যা বলে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। আবার কিছু ট্রাভেল এজেন্ট বিদেশ গমনেচ্ছুদের কাছে মিথ্যা কথা, বানোয়াট ভিসা দিয়ে পাঠাতে চাইছে সরলপ্রাণদের। তারা ধরা পড়ছে বিমানবন্দরে। অনেকে জালিয়াত চক্রের হাতে অর্থ দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেক মানুষ সর্বশেষ সম্বল বিক্রি করে বা চড়া সুদে টাকা ধার করে এনে বিদেশে যাওয়ার শেষ স্তর বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তার ভিসা জাল।

বিদেশগমনেচ্ছু শ্রমজীবীর সঙ্গে প্রতারণা চলছে দীর্ঘদিন। এটি একটি সিন্ডিকেট। এর সঙ্গে জড়িত আছে জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর কিছু লোক, ট্রাভেল এজেন্ট। এখন আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সের সহযোগে প্রতারকচক্র নিপুণভাবে নকল ভিসা বের করছে, যা দেখতে আসলের মতো। নকল ধরা কষ্ট। বিশেষজ্ঞ ছাড়া তা ধরা কঠিন। ফলে প্রতারণার নতুন জালে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। কিছু ট্রাভেল এজেন্ট জড়িত এই অপরাধ-অপকর্মে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ভালোভাবে জানেন বিষয়টি। কিন্তু তারা এ রকম অমানবিক প্রতারণা বন্ধের উদ্যোগ নেয় না। সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের মনোভাব হচ্ছে, ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ’ তাড়ানোর মতো। তারা মনেই করে না যে, এই প্রতারণা বন্ধ হোক। কী করে এই প্রতারণা চক্রের সিন্ডিকেট ভাঙবে সরকার, তা তাদেরই বের করতে হবে। কারণ তারা জানে, জালিয়াত চক্রের তৎপরতা কীভাবে হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) একজন সাবেক মহাসচিব বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একাধিক প্রতারক চক্র জাল ভিসা প্রতারণা করে আসছে।’ তার মানে হচ্ছে, বায়রা জানে একাধিক প্রতারক চক্রের তথ্য। জানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মানুষরা। সমাজের সাধারণ মানুষও জানে। কিন্তু প্রতারকদের আইনের আশ্রয়ে আনার কোনো সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন হয় না, হয়নি।

দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে নিজেদের পরিচিত করেছে বীর কর্মজীবী হিসেবে। কিন্তু তাদের বীরত্ব সব কিছুকে ছাপিয়ে কান্নার শব্দে ডুবে যাচ্ছে। শ্রমের দামই আমাদের আর্থিক ঐশ্বর্যের মূল শক্তি হলেও, বিদেশের মাটিতে তারা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের হাইকমিশন ও দূতাবাসের কর্তারা তেমন উপকারে আসে না। সামাজিকভাবে এই প্রতারক চক্র বা জালিয়াতদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ যদি আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তাহলে সরকারের টনক নড়বে। প্রতারিত লোকরাও প্রতিবাদের নিশান তুলে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে পারে। সরকার চাইলে প্রতিটি ভিসা সঠিক কি না, তা যাচাই করে প্রার্থীকে সঠিক উত্তর জানাতে পারে। ওয়েজ আর্নার হিসেবে নিবন্ধন করার সময়, তাদের ভিসা বৈধ নাকি জাল,  তা যাচাই করতে পারে। এই ব্যবস্থা না থাকলে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের মতো মেশিন রিডেবল ভিসা চেকও করা যেতে পারে। এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সেটা করবে, নাকি প্রতারক চক্র পুষে রাখবে। মনে রাখতে হবে, এই যোদ্ধারাই আমাদের প্রাণ। বারবার এই কথা বলছি, এর কারণ হচ্ছে যদি কখনো তারা বেঁকে বসেন, যদি কখনো ভিন্নপথ অবলম্বন করেন তখন তার দায় কে নেবে?