শনাক্ত বাড়লেও হামে গুরুত্ব দেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার

হামের লক্ষণ নিয়ে এক দিনে চার শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এই সময়ে লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৮৫ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ৩ হাজার ৭০৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৭ শিশুর। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামে ১৩ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হতে পেরেছে। স্স্থু হয়ে বাসায় ফিরেছে ১ হাজার ৯৩০ জন।

দেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট নয়, বরং এর আগাম সতর্ক সংকেত ছিল স্পষ্ট এবং উদ্বেগজনক। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই নমুনা পরীক্ষায় অস্বাভাবিক হারে সংক্রমণ শনাক্ত হতে শুরু করে। কোনো দিন ৩০ শতাংশ, আবার কোনো দিন ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছিল। বিষয়টি জানুয়ারির শুরুতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওই সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বর্তমানের এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো যেত।

স্বাস্থ্য খাতের একাধিক সূত্র জানায়, জানুয়ারিতে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ শনাক্ত হার দেখা যাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে রোগের তীব্রতা বাড়তে থাকে। মার্চে এসে রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে নিয়ে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জানুয়ারিতেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দিকে যাচ্ছে। একাধিকবার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন যে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, তা সেই অবহেলারই ফল।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। সময়মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা না নিলে এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এতগুলো শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এদিকে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে জটিলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি টিকা ক্রয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি বা বিলম্ব এই প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকে, তবে এর সঙ্গে জড়িতদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।

বিশেষজ্ঞরা হামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতির কথা তুলে ধরছেন। দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি প্রতি ৪ বছর অন্তর একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা থাকলেও ২০২৪ সালে রাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী বছরেও বিভিন্ন কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, যা এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে হামের শনাক্তের হার ছিল মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ। কিন্তু এবার সেই হার বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবানুবীদ (লিড ভাইরোলজিস্ট- এনপিএমএল ল্যাব) ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মার্চ মিলে আড়াই হাজার টেস্ট করেছি। তাতে শনাক্তের হার দেখা যাচ্ছে ৩০ শতাংশ। আমাদের সার্ভিলেন্স ল্যাবরেটরি। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। পৃথিবীতে যতগুলো হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরি আছে, এটি তার একটি। সার্ভিলেন্স ল্যাবরেটরির উদ্দেশ্য হলো সারা দেশের যেখানেই জ্বর কাশি র‌্যাশ থাকবে, তাদের স্যাম্পলগুলো এনে পরীক্ষা করে দেখা। বিগত কয়েক বছরের ইতিহাস হচ্ছে বছরে ৬ থেকে ৭ হাজার স্যাম্পল আসে। পরীক্ষায় তার অধিকাংশই নেগেটিভ পেয়েছি। পজেটিভ ১ থেকে ৩ শতাংশ পেয়ে আসছি। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম পাই গত ডিসেম্বরে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে একটু বাড়ন্ত ছিল। তখন শনাক্তের হার ছিলো ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। পরে জানুয়ারিতে বাড়ল, ফেব্রুয়ারিতে মার্চে একটু বেশি বেড়েছে। বেড়েছে বলতে নমুনা সংগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু সনাক্তের হার ওই একই। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই কোনো দিন শনাক্ত পেয়েছি ৩০ শতাংশ আবার কোনো দিন ৩৫ শতাংশ। ধরেন নমুনা যদি ১০০ পেতাম, তার মধ্যে হয়তো ৩০টি পজিটিভ আসত। যদি ২০০ পেতাম হয়তো ৬০টি পজিটিভ আসত। তবে সিভিয়ারিটি বেড়েছে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এবং মার্চে। জানুয়ারি থেকেই এটা জানানো হচ্ছিল।

এরকম পরিস্থিতি ২০১৮ সালে একবার হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডকে আউটব্রেক হয়। ওটা আমরা কনটেইন করতে পেরেছিলাম। কারণ ওখানে ভ্যাক্সিনেশনের অল্প কিছু গ্যাপ ছিল। কিন্তু এবার যেটা হয়েছে, ভ্যাক্সিনেশনের গ্যাপ অনেক বেশি। ইনশা আল্লাহ রোববার থেকে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করবে। শুরু হলে দেখবেন দুই সপ্তাহের মধ্যে এটা কমে আসবে। আগের অভিজ্ঞতা তাই বলে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি জানান, হাম প্রতিরোধে বর্তমান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হঠাৎ করে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তবে অল্প সময়ে হাম প্রতিরোধে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আগামী রবিবার থেকে সারা দেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে। এতগুলো শিশু মৃত্যুর ঘটনায় আমি মর্মাহত। ঢাকা, রাজশাহীসহ সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে হামের চিকিৎসায় কয়েকটি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী ও মানিকগঞ্জে ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে সব স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য কর্মীদের অনেক সংকট আছে, সমস্যা আছে এবং এ ব্যাপারে আমরা এরই মধ্যে অবগত হয়েছি। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আপনাদের সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করব। কিন্তু এর আগে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আপনাদের সহযোগিতা চাইছি।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, টিকা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত বেশকিছু স্বাস্থ্য সহায়তাকারী দীর্ঘ সময় ধরে বেতন পাচ্ছে না, এটা তাদের মধ্যে অনেক বড় একটি কষ্ট। এ ছাড়া কয়েক হাজার স্বাস্থ্য সহকারী, সহ-স্বাস্থ্য সহকারী ও স্বাস্থ্য পরিদর্শক এ রকম বেশ কিছু পদে পদোন্নতি বা গ্রেড উন্নয়নের দাবি আছে, তা বিবেচনা করা হবে।

ডাক্তারদের অবদান ও মানবিকতার বিষয় উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ করব, আপনারা চিকিৎসা নৈতিকতার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ‘বিশ্বাস’কে প্রাধান্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক : ‘হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে টিকা ক্রয়-সংক্রান্ত জটিলতায় টিকার অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে কিনা, যদি সেই কারণে বৃদ্ধি পায়, তাহলে জড়িতদের তদন্তসাপেক্ষে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যমকর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী এবং বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।

বক্তারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেন। তারা টিকাদান কর্মসূচির জোরদারকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা উন্নয়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি, মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।

টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে একজন বক্তা দাবি করেন, ক্রয়-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যদি আজ হামের প্রাদুর্ভাব এতো বৃদ্ধি পায় এবং তা যদি শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে, তবে এর সঙ্গে জড়িতদের তদন্তসাপেক্ষে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে অতিথিরা টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে যেন জন দুর্ভোগ না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. হানিফ, ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম, বাংলা ভিশনের প্রধান সম্পাদক আব্দুল হাই সিদ্দিক, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক, গবেষক ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা, বিএমইউর শিশুরোগ বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইয়ামিন শাহরিয়ার চৌধুরী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. তৌহিদ ইসলাম, বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, বিএমইউর এনেস্থিসিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, বিএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীসহ অনেকে।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থেকে আসা শিশুটির বয়স ৯ মাসের কম ছিল। এ নিয়ে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।

গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে গতকাল পর্যন্ত ৪৩ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে জেলার বিভিন্ন হামপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০ মাস বয়সের একটি কন্যাশিশু মারা গেছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। একজনের হাম পজেটিভ রেজাল্ট এসেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৩০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ রোগী গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পর‌্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছে।

কুমিল্লা : কুমিল্লায় হামের পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগছে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা। এই সময়জুড়ে রোগীদের আলাদা করে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁওয়ে হাম ও রুবেলার সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নতুন করে হামে আক্রান্ত সম্ভাব্য আরও ১২ শিশুকে শনাক্ত করা হয়েছে। জেলায় মোট আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : জেলার সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগী ভর্তি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মসিউর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৮ শিশু ভর্তি রয়েছে।’ তবে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে বলেও তিনি জানান। জেলায় এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৩৭ জন। এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি ৩১ শিশুর স্যাম্পল পরীক্ষায় ১৫ জনের হাম পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মসিউর রহমান নলেন, ‘হাম শনাক্তের ব্যবস্থা জেলা পর্যায়ে নেই। নমুনা সংগ্রহ করে আমরা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে দিচ্ছি। তারা ঢাকার মহাখালী নিয়ে যাচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা রিপোর্ট থেকে ১০ থেকে ১৪-১৫ দিন সময় লাগে। তবে এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হয় না। আমরা তাদের স্বাভাবিক চিকিৎসা দিচ্ছি’।

হাকিমপুর (দিনাজপুর) : দেশের অন্যান্য স্থানের মতো দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতেও সন্দেহভাজন একজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জানায়, ‘নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে নিশ্চিত করা যাবে সে হামে আক্রান্ত কি না।’

এদিকে আগামী রবিবার থেকে হামের টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে। এ বিষয়ে হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইফতেখার জাহান বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত পরিমাণে হামের টিকা আছে। যাদের ৯ মাস বা ১৫ মাসে টিকা নেওয়ার কথা কিন্তু তারা নেননি সেটাসহ যাদের সামনে টিকা লাগবে, তাদের সবাইকে টিকা দিতে পারব। যথেষ্ট পরিমাণে হামের টিকা মজুদ আছে, আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।’

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৯ শিশু। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১৭২ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯৪ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এ ছাড়া এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুর। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ১০ শিশু।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, ‘হামের রোগীদের জন্য হাসপাতালে ৬৪ শয্যাবিশিষ্ট পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে তিনটি মেডিকেল টিম নিয়মিতভাবে চিকিৎসা চালাচ্ছে। বর্তমানে শয্যার তুলনায় শিশুদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাসপাতাল পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।’

নীলফামারী : জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ছয় শিশু। তারা আইসোলেশন বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. দেবাশীষ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছয় শিশুকে হাসপাতালের আইসোলেশন বিভাগে রাখা হয়েছে। তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।