গ্দ্বিরাতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯৪৯ সালে যখন উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো গঠিত হয়েছিল, তখন এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন প্রতিহত করা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জোট বিশ্বরাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন রাজনীতিতে উত্থান এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূলে এক প্রবল নাড়া দিয়েছে। ট্রাম্প প্রথম থেকেই ন্যাটোকে একটি 'অপ্রাসঙ্গিক' বা 'অচল' সংস্থা হিসেবে অভিহিত করে এসেছেন। তাঁর এই অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অর্থনৈতিক। ট্রাম্পের মতে, আমেরিকা ন্যাটোর সিংহভাগ খরচ বহন করছে, অথচ ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছেনা। এই 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা 'আমেরিকা আগে' নীতি আসলে আমেরিকার দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিকতাবাদী ভূমিকা থেকে সরে আসার একটি সংকেত ছিল।
ট্রাম্পের এই মনোভাব কেবল কথার কথা ছিল না। ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তিনি বারবার বলেছেন যে, যে দেশগুলো তাদের জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে না, আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারে। এটি ন্যাটোর মূল ভিত্তি 'আর্টিকেল ৫' বা যৌথ নিরাপত্তা নীতির ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দেয়। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জোটভুক্ত কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়। ট্রাম্প যখন ইঙ্গিত দেন যে তিনি আক্রান্ত দেশে সাহায্য পাঠাবেন কি না তা নির্ভর করবে সেই দেশের চাঁদা প্রদানের ওপর, তখন থেকেই আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্য যে, ন্যাটোর ইতিহাসে আর্টিকেল ৫ মাত্র একবার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে—২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর, এবং সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই। অর্থাৎ, ন্যাটো কেবল ইউরোপকে সুরক্ষা দেয়নি; বরং আমেরিকার সুরক্ষায়ও সরাসরি দাঁড়িয়েছে।
.
প্রতিরক্ষা বাজেটের জটিলতা এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ:
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে 'চাঁদা না দেওয়ার' অভিযোগ তোলেন, তখন তিনি আসলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের একটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দেন। ন্যাটোর নীতি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ওয়েলস সম্মেলনেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। কিন্তু ট্রাম্প যখন ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসেন, তখন দেখা গেল হাতেগোনা কয়েকটি দেশ—যেমন আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, গ্রিস এবং এস্তোনিয়া ছাড়া আর কেউ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি। ট্রাম্পের চোখে এটি ছিল এক ধরনের 'কূটনৈতিক প্রতারণা'। তিনি বিষয়টিকে কোনো আদর্শিক জোট হিসেবে না দেখে বরং একটি বাণিজ্যিক চুক্তির মতো বিবেচনা করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত সোজাসাপ্টা—আমেরিকা যদি বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়, তবে বাকিদেরও সেই খরচের সমান ভাগীদার হতে হবে।
এই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের শেকড় কিন্তু অনেক গভীরে। ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মনে করে, ওয়াশিংটনের অভিজাত রাজনীতিবিদেরা গত কয়েক দশক ধরে বিদেশের মাটিতে যুদ্ধের পেছনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন, অথচ আমেরিকার নিজের অবকাঠামো, রাস্তাঘাট বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে নজর দেননি। ট্রাম্প যখন 'আমেরিকা ফার্স্ট' স্লোগান দেন, তখন তিনি আসলে এই বঞ্চিত শ্রেণির কথা বলছিলেন। তাঁর মতে, জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলো যখন তাদের জিডিপির বিশাল অংশ শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় করতে পারে, তখন তারা কেন প্রতিরক্ষা বাজেটে কার্পণ্য করবে? বিশেষ করে জার্মানির মতো একটি অর্থনৈতিক শক্তি যখন রাশিয়ার কাছ থেকে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের মাধ্যমে সস্তায় গ্যাস কিনছে এবং একই সাথে রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমেরিকার সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে, তখন ট্রাম্পের এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকা ন্যাটোর মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় সত্তর শতাংশ একাই বহন করছে, যা মার্কিন অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা।
তবে ন্যাটোর এই দুই শতাংশ খরচের হিসাবটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। অনেক ইউরোপীয় দেশ যুক্তি দেয় যে, প্রতিরক্ষা ব্যয় কেবল অস্ত্রের কেনাবেচার ওপর নির্ভর করে না। পোল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলো যে পরিমাণ ব্যয় করছে, তার চেয়ে ফ্রান্স বা ইতালির ব্যয় করার সক্ষমতা বা প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প এই সূক্ষ্ম কূটনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি এমনকি ব্রাসেলসের এক সম্মেলনে ন্যাটোর সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে বাকি রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে সরাসরি বলেছিলেন যে, যদি তারা তাদের বকেয়া পরিশোধ না করে, তবে আমেরিকা তাদের রক্ষা করতে বাধ্য নয়। এটি কেবল একটি আর্থিক দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল ন্যাটোর সাত দশকের পারস্পরিক আস্থার মূলে কুঠারাঘাত। কারণ, ন্যাটোর কার্যকারিতা নির্ভর করে এই বিশ্বাসের ওপর যে, বিপদে পড়লে আমেরিকা অবশ্যই আসবে। ট্রাম্প যখন সেই বিশ্বাসে চিড় ধরান, তখন থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প চিন্তা করতে শুরু করে।
এই বিতর্কের আরেকটি দিক হলো আমেরিকার সামরিক শিল্প বা 'মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স'। ট্রাম্প চাইতেন ইউরোপীয় দেশগুলো যেন তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ায় এবং সেই টাকা দিয়ে মার্কিন অস্ত্র কেনে। লকহিড মার্টিন বা বোয়িং-এর মতো কোম্পানিগুলোর জন্য এটি ছিল এক বিশাল বাজার তৈরির সুযোগ। ফলে ট্রাম্পের এই হুমকির পেছনে কেবল জনকল্যাণ নয়, বরং আমেরিকার অস্ত্র শিল্পের প্রসারের একটি গোপন উদ্দেশ্যও ছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। তিনি যখন ন্যাটোর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন আসলে তিনি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার 'রক্ষক' ইমেজের পরিবর্তে একটি 'ভাড়াটে সেনাদল' বা 'মার্সেনারি' ইমেজের প্রবর্তন করতে চাইছিলেন, যেখানে নিরাপত্তা হবে একটি ক্রয়যোগ্য পণ্য। বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ট্রাম্পের এই হুমকির ফলে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ালেও, তাদের মধ্যে আমেরিকার প্রতি এক ধরনের চিরস্থায়ী অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রয়োজন—এই ‘৭০ শতাংশ’ আসলে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেটের সম্মিলিত হিসাবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক অংশ। এটি ন্যাটোর কেন্দ্রীয় তহবিলে সরাসরি প্রদত্ত কোনো চাঁদা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যে এই পরিসংখ্যান শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
ট্রাম্প বিষয়টিকে আদর্শিক জোট হিসেবে না দেখে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির মতো বিবেচনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল—নিরাপত্তা যদি যৌথ হয়, তবে ব্যয়ও যৌথ হতে হবে। বিশেষ করে তিনি জার্মানির দিকে আঙুল তোলেন—যে দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় গ্যাস কিনছে, অথচ রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভর করছে।
.
ক্রেমলিনের সন্তুষ্টি এবং ইউরোপের 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন:
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখনই ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রতিধ্বনি শোনা যায় মস্কোর ক্রেমলিনে। ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ন্যাটোর সম্প্রসারণ রোধ করা এবং এই জোটের ভেতরে বিভাজন তৈরি করা। ট্রাম্পের 'ন্যাটো ছাড়ার হুমকি' পুতিনের জন্য ছিল এক অপ্রত্যাশিত উপহার। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া নিজেকে যে অপমানিত বোধ করেছিল, তার প্রধান কারণ ছিল ন্যাটোর পূর্বমুখী অগ্রযাত্রা। ট্রাম্প যখন আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে বিতর্কে জড়ান, তখন পুতিন সুযোগ পান ইউরোপের দেশগুলোকে এই বার্তা দেওয়ার যে—আমেরিকা কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের পর। যদিও বর্তমান বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে দুহাত ভরে সাহায্য করেছে, কিন্তু ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা পুতিনের জন্য যুদ্ধের ময়দানে এক নতুন আশার আলো তৈরি করেছে। ট্রাম্পের এই অবস্থান যদি বাস্তব হয়, তবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে, কারণ ইউরোপ এককভাবে ইউক্রেনের সামরিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। এই আশঙ্কাই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বা 'Strategic Autonomy' নামক এক নতুন ধারণার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ কয়েক বছর আগেই বলেছিলেন যে, ন্যাটোর 'মস্তিষ্ক মৃত্যু' বা 'Brain Death' ঘটেছে। ট্রাম্পের হুমকির পর মাখোঁর সেই কঠোর উক্তি এখন ইউরোপের অনেক নেতার কাছেই বাস্তব সত্য মনে হচ্ছে।
ইউরোপের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, তাদের নিজেদের একটি সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। কিন্তু এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। জার্মানির মতো দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বড় ধরনের সামরিক শক্তি হওয়া থেকে বিরত থেকেছে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কলঙ্কিত ইতিহাসের কারণে। কিন্তু এখন পরিস্থিতির চাপে তারাও তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ১০০ বিলিয়ন ইউরো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকির ফলে ইউরোপের দেশগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং যৌথ মহড়া বাড়াচ্ছে। তবে সমস্যা হলো, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব। পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির মতো দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ে আমেরিকার ওপর বেশি ভরসা করতে চায়। ফলে ট্রাম্পের এই নীতি কেবল আটলান্টিকের দুই পাড়েই ফাটল ধরানি, বরং খোদ ইউরোপের ভেতরেও এক ধরনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। এছাড়া ট্রাম্পের এই ভূমিকার কারণে ন্যাটোর ভেতরে তুরস্কের মতো দেশগুলো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনেছে, যা ট্রাম্পের আমলে শুরু হওয়া ন্যাটোর বিশৃঙ্খলারই একটি বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প যদি সত্যি ন্যাটো থেকে বের হয়ে যান, তবে পুরো ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি বিশাল শূন্যতার মধ্যে পড়বে। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে রাশিয়ার প্রভাব যেমন বাড়বে, তেমনি চীনও ইউরোপের বাজারে নিজের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পাবে। ফলে ট্রাম্পের এই 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকেই বিশ্বমঞ্চে একা করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
.
আইনি ব্যারিকেড এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই:
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কোনো জনসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে তিনি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাবেন, তখন তা শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, মার্কিন আইনি কাঠামোতে তা কার্যকর করা ততটাই জটিল। আমেরিকার ইতিহাসে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে একক সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতির বেরিয়ে যাওয়ার নজির খুব একটা সুখকর নয়। তবে ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি আচরণ আঁচ করতে পেরে মার্কিন কংগ্রেস (আইনসভা) আগেভাগেই কিছু সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে মার্কিন সেনেটে একটি দ্বিদলীয় বিল পাস করা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্রপতি সেনেটের দুই-তৃতয়াংশ ভোট বা কংগ্রেসের বিশেষ আইন ছাড়া ন্যাটো ত্যাগ করতে পারবেন না। এটি ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল আইনি দেয়াল।তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোতে আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক আছে। ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্ট এই আইনি সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতির মারপ্যাঁচে এই আইনি দেয়াল কি যথেষ্ট? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ট্রাম্প যদি আবারও হোয়াইট হাউসে বসেন, তবে তিনি সরাসরি ন্যাটো ত্যাগ না করেও জোটটিকে ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে দিতে পারেন। একজন ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ হিসেবে তাঁর হাতে সামরিক বাহিনীর ওপর ব্যাপক ক্ষমতা থাকে। তিনি চাইলেই ইউরোপে মোতায়েন করা কয়েক হাজার মার্কিন সৈন্যকে সরিয়ে নিতে পারেন, ন্যাটোর যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, কিংবা ন্যাটোর সদর দপ্তরে মার্কিন প্রতিনিধি পাঠানো বন্ধ করে দিতে পারেন। যদি ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যটিই মানসিকভাবে জোট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তবে কাগজে-কলমে সদস্যপদ থাকা না থাকা সমান কথা। এই ‘সফট এক্সিট’ বা অলিখিত প্রস্থানই ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে এই নিয়ে এক বিশাল আদর্শিক লড়াই চলছে। আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই এখন দুটি ভাগ হয়ে গেছে। একদল মনে করে, আমেরিকার উচিত বিশ্বজুড়ে তার আধিপত্য বজায় রাখা এবং ন্যাটোর মাধ্যমে রাশিয়া ও চীনকে রুখে দেওয়া। অন্যদলটি ট্রাম্পের ‘আইসোলেশনিজম’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদে বিশ্বাসী। তারা মনে করে, বিদেশের যুদ্ধের পেছনে ডলার খরচ করা মানে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারা। ট্রাম্পের এই মতবাদ এখন কেবল তাঁর একার নয়, বরং এক নতুন প্রজন্মের মার্কিন রাজনীতিকদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। ফলে ট্রাম্প যদি ক্ষমতায় নাও থাকেন, তবুও ন্যাটোর প্রতি আমেরিকার এই অবিশ্বাসের সুর আগামী কয়েক দশক ধরে শোনা যেতে পারে।
অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটরা এবং কিছু উদারপন্থী রিপাবলিকানরা মনে করেন, ন্যাটো কেবল ইউরোপের রক্ষা কবচ নয়, বরং এটি আমেরিকার নিজের স্বার্থেই দরকার। ইউরোপ যদি অস্থিতিশীল হয়, তবে তার প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতেও পড়বে। কিন্তু ট্রাম্পের যুক্তি হলো, আমেরিকা কেন বারবার অন্যদের ‘ত্রাতা’ সাজবে? এই বিতর্কটি এখন কেবল নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আমেরিকার জাতীয় পরিচয়ের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা মনে করেন, ন্যাটো ত্যাগ করা মানে হলো আমেরিকার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া, আর বিরোধীরা মনে করেন এটি হবে আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অপমৃত্যু। এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ন্যাটোর মিত্রদের মনে যে গভীর সংশয় তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ এবং একটি 'আমেরিকা-পরবর্তী' বিশ্ব:
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো ছাড়ার হুমকি কেবল একটি সামরিক জোটের ভাঙন নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গত ৮০ বছরের স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থার অবসানের সংকেত। যদি আমেরিকা সত্যিই ন্যাটো থেকে তার সমর্থন কমিয়ে নেয় বা পুরোপুরি বেরিয়ে যায়, তবে তার প্রথম এবং প্রধান প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক আস্থার ওপর। জাপানের টোকিও থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা—প্রত্যেকটি দেশ যারা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’র ওপর ভিত্তি করে তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি সাজিয়েছে, তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। আমেরিকা যদি তার ইউরোপীয় ভাইদেরই বিপদে একা ফেলে যেতে পারে, তবে এশিয়ার মিত্রদের ক্ষেত্রে তারা কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে—এই প্রশ্নটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত সমীকরণ।
এই শূন্যস্থান পূরণে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হবে চীন। বেইজিং দীর্ঘকাল ধরেই ‘আমেরিকা-কেন্দ্রিক’ বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে একটি ‘বহুমেরু’ বিশিষ্ট বিশ্বের কথা বলে আসছে। ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি চীনকে সেই সুযোগটিই থালায় সাজিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলো যখন দেখবে আমেরিকা আর তাদের পাশে নেই, তখন তারা বাধ্য হয়ে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করবে। এটি শেষ পর্যন্ত পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক শক্তির যে জোট ছিল, তাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেবে। ফলে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকেই বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বহীন এক দ্বীপে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা মার্কিন অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের পরিপন্থী।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোকে এক ধরনের ‘শক থেরাপি’ দিয়েছে। তারা গত কয়েক দশক ধরে যে আয়েশি নিরাপত্তা বলয়ে ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এখন তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পোল্যান্ড, জার্মানি এবং ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা বাজেটে যে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো ট্রাম্পের কড়া কথা ছাড়া সম্ভব হতো না। কিন্তু সমস্যা হলো, সামরিক শক্তি কেবল অস্ত্র বা বাজেটের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে একটি অভিন্ন লক্ষ্য এবং আস্থার ওপর। ট্রাম্প যদি সেই আস্থার জায়গাটিই ধ্বংস করে দেন, তবে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র দিয়েও ন্যাটোর মতো একটি কার্যকর জোট পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে না।
উপসংহারে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো ত্যাগের হুমকি যতটা বাস্তবসম্মত, তার চেয়েও বেশি এটি একটি আদর্শিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি আমেরিকাকে এমন এক পথে নিয়ে যেতে চান যেখানে কোনো আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা থাকবে না, কেবল থাকবে তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসাব। কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে ‘একলা চলো’ নীতি সবসময় ফলপ্রসূ হয় না। যদি আমেরিকা ন্যাটো ত্যাগ করে, তবে তা হবে ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংয়ের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয়। পৃথিবী তখন এমন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াবে যেখানে কোনো আন্তর্জাতিক আইন থাকবে না, বরং ‘যার জোর তার মুলুক’—এই আদিম প্রথাই হবে বিশ্ব শাসনের মূলমন্ত্র। ট্রাম্পের এই হুমকি তাই কেবল ন্যাটোর জন্য নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আগামী নির্বাচন এবং আমেরিকার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপই ঠিক করে দেবে, এই হুমকি কি কেবল ইতিহাসের একটি তিক্ত অধ্যায় হিসেবে থাকবে, নাকি এটিই হবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার শেষ পেরেক।
(লেখক একজন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক)