রোবট টুনটুন

রোবট টুনটুন খুব রাগী।

এতটাই রাগী যে, সকালে ঘুম ভাঙলেই তার চোখ দুটো লাল বাতির মতো জ¦লে উঠত। নিজের লোহার বুকের ভেতর গমগম শব্দ তুলে সে বলতে থাকে, আজ কাউকে না কাউকে বকবই। না বকলেই সার্কিট ঠিক থাকে না।

রোবটদের শহরটা চকচকে ধাতুর। রাস্তাগুলো সোজা, আকাশে তারের জাল, বাতাসে তেলের গন্ধ। সেখানে রাগই শক্তির চিহ্ন। যে যত জোরে চেঁচাতে পারে, তার ব্যাটারি তত শক্তিশালী বলে ধরা হয়।

রোবটদের স্কুলেও নিয়ম তাই। ক্লাসে কেউ উত্তর না জানলে, শিক্ষক রোবট রাগ করে চেঁচায়। ছাত্ররাও শিখেছে, রাগ দেখাতে পারলেই নম্বর বাড়ে। টুনটুন ছিল সবার সেরা। তার চিৎকারে জানালার কাচ কেঁপে উঠে, দেয়ালের নাট-বল্টু ঢিলা হয়ে যায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে টুনটুনের রাগ সীমা ছাড়িয়ে গেল। একদিন সে দরজা বন্ধ পেয়ে রাগে লাথি মারল। দরজা ভেঙে দুমড়ে গেল। আরেক দিন অঙ্ক না মিললে বেঞ্চে ঘুষি মারল। বেঞ্চটা কাগজের মতো ভেঙে পড়ল। ক্লাসের রোবটরা ভয়ে পিছিয়ে গেল।

প্রধান রোবট, যার মাথায় ছিল সোনালি অ্যান্টেনা, গম্ভীর গলায় বললেন, টুনটুন, শুধু রাগ থাকলে চলবে না। শক্তি মানে নিয়ন্ত্রণ। তোমাকে মানুষের স্কুলে পাঠানো হচ্ছে।

এই কথা শুনে টুনটুনের চোখ আরও লাল হলো।

মানুষ! ওরা তো নরম, ধীর, শব্দ কম করে।

হ্যাঁ, সেখানেই শেখার আছে।  বললেন প্রধান রোবট।

পরদিন টুনটুন মানুষের স্কুলে পৌঁছাল। ছোট ছোট বেঞ্চ, দেয়ালে রঙিন ছবি, জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে। টুনটুন দরজায় ঢুকেই গর্জে উঠল, লাইন করে দাঁড়াও।

তার কণ্ঠে লোহার প্রতিধ্বনি। কিন্তু আশ্চর্য! বাচ্চারা ভয় পেল না। একজন মুচকি হেসে বলল, আমরা তো দাঁড়িয়েই আছি।

টুনটুন থমকে গেল। কেউ দৌড়াল না, কেউ কাঁদল না। যেন তার চিৎকার বাতাসে হালকা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।

টিফিনের সময় টুনটুন আরও অবাক হলো। সে দেখল, এক ছেলে তার খাবার বাক্স খুলে আরেক ছেলেকে বলছে, চাও তো আমার খাবার ভাগ করে খেতে পারো।

টুনটুন ধাতব ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, রাগ করছ না? খাবার কমে যাবে যে।

ছেলেটা হাসল, সব কথায় রাগ করলে বন্ধুই থাকবে না।

এই কথা টুনটুনের ভেতরে কোথাও যেন টুং করে লাগল। তার ভেতরের গিয়ারগুলো ধীরে ঘুরতে লাগল।

দিনের পর দিন সে লক্ষ্য করল, মানুষরা জোরে কথা না বলেও কাজ করিয়ে নেয়। শিক্ষক নরম গলায় বলেন, তবু সবাই শোনে। কেউ ভুল করলে চেঁচায় না, বুঝিয়ে দেয়। আশ্চর্যভাবে, তাতেই কাজ হয়।

একদিন ক্লাসে চেয়ার কম পড়ে গেল। টুনটুন অভ্যাসমতো চেঁচাতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ল টিফিনের সময়ের হাসি। সে ধীরে, একটু কষ্ট করে বলল, দয়া করে একটু সরে বসবে?

শব্দগুলো তার মুখ থেকে বেরোতে যেন মরিচা লাগছিল। কিন্তু ফল হলো আশ্চর্য। সবাই সঙ্গে সঙ্গে সরে বসল। কেউ চোখ রাঙাল না, কেউ বিরক্ত হলো না।

টুনটুন নিজের হাতের দিকে তাকাল। কোনো দরজা ভাঙেনি, কোনো বেঞ্চ ভাঙেনি। তবু কাজ হয়ে গেছে।

সেদিন রাতে রোবট টুনটুন ডায়েরি খুলল। ডায়েরিটা ছিল ইস্পাতের পাতায় বানানো, তাতে লেখার সময় খটখট শব্দ হয়। সে লিখল, রাগ কমালে শক্তি কমে না। বরং মানুষ কথা শোনে।

লেখা শেষ করে সে জানালার বাইরে তাকাল। মানুষের শহরের আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল। সেই আলোয় টুনটুনের চোখের লাল আলো একটু নরম হয়ে এলো।

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে সে আর বলল না, আজ কাউকে বকবই। বরং ভাবল, আজ কাউকে বুঝিয়ে বলব।

রোবট হয়েও সে শিখে ফেলল, আসল শক্তি চেঁচানোতে নয়, নিয়ন্ত্রণে। আর রাগ ছাড়াও শক্তিশালী হওয়া যায়, যদি কথা বলার ভেতরে সম্মান থাকে।