পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক নতুন শ্রেণিবিন্যাস চালুর পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির এমন সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বের দেশগুলোকে এখন থেকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হবে—বন্ধুত্বপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং শত্রুভাবাপন্ন। তেহরান জানিয়েছে, যেসব রাষ্ট্রকে তারা ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করবে, তাদের কোনো জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি বা মাশুল প্রদান করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এই আন্তর্জাতিক নৌপথের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
তেহরানের এই নতুন শ্রেণিবিন্যাসের মূল লক্ষ্য মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো। ইরান সরাসরি এসব দেশকে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ হিসেবে বিবেচনা করছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করতেই ইরান এই কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইতোমধ্যে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের ঠিক আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাত। তবে উত্তেজনার ফলে বর্তমানে জাহাজ চলাচলের এই হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের মোট তেল মজুতের ৩৩ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ২১ শতাংশ অবস্থিত। ফলে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ বা ফি আদায়ের প্রচেষ্টা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জিসিসি দেশগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের এই একতরফা সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মতে, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা চুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত একটি অঞ্চল। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের বর্তমান মর্যাদা বা ‘স্ট্যাটাস’ পরিবর্তন করতে দেওয়া হবে না। কারণ, ইরান যদি এই চোকপয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফি আদায় শুরু করে, তবে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।