বাংলাদেশে একসময় টিকাদান কর্মসূচির সফলতা, বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে, শহরের বস্তি সবখানে শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে উঠেছিল। সেই অর্জন শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য ছিল না, এটি ছিল জনস্বাস্থ্যের এক নীরব বিপ্লব। অথচ আজ আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে হাম, একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ অথচ অবাক যে, এটি শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে! এটি কি নিছক স্বাস্থ্য সংকট? নাকি নীতির ব্যর্থতা, পরিকল্পনায় দুর্বলতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সম্মিলিত ফল! হাম কোনো রহস্যময়, অজানা রোগ নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যার বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে, টিকাদানের উচ্চ কাভারেজের কারণে, হাম কার্যত নিয়ন্ত্রিত। তাহলে বাংলাদেশে কেন এটি আবার ফিরে এলো? উত্তরটি খুঁজতে গেলে, আমাদের তাকাতে হবে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে, যেখানে আজ স্পষ্ট ভাঙন দেখা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকার ঘাটতি বাস্তব এবং তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ঘাটতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।
টিকা সংগ্রহ একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে চাহিদা নিরূপণ, আন্তর্জাতিক ক্রয়, সংরক্ষণ এবং বিতরণ সবকিছু সময়মতো করতে হয়। এখানে সামান্য বিলম্বও বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অথচ আমরা দেখছি, সেই প্রক্রিয়াটিই অবহেলার শিকার হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে, টিকা সংগ্রহ করা হলেও হঠাৎ করে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে। দাতা নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার ধারণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল, সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং বিকল্প ব্যবস্থা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই প্রস্তুতি ছিল না। ফলে পুরনো সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়েছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এই মধ্যবর্তী শূন্যতাই আজকের সংকটের মূল। এই ব্যর্থতার দায় কার? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই দায় এড়াতে পারে না। তাদের পরিকল্পনা, তদারকি এবং সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। একইভাবে ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা এবং ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রশ্ন হলো, কেন আগাম সতর্কতা নেওয়া হলো না? কেন সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায়, বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা হলো না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা, বা বলা ভালো উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা রয়েছে। সরকারের ভূমিকাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
অন্তর্র্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়নি। একটি সংবেদনশীল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, হঠাৎ করে কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসা ঝুঁকিপূর্ণ। সেই ঝুঁকির মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে, ধাপে ধাপে হঠাৎ করে নয়। বর্তমান সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে। বিগত সরকার টিকাদান কর্মসূচিকে একটি সাফল্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এর ভিতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। মাঠপর্যায়ে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় যে ঘাটতি ছিল, তা দীর্ঘদিন ধরেই জমা হচ্ছিল। কাগজে-কলমে সাফল্য থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় টিকাদান সেবা দুর্বল ছিল। ডেটা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। প্রকৃত টিকাদান কভারেজ কত, কোথায় ঘাটতি এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্যের অভাব নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করেছে। ফলে সময়মতো সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাস্তবতা উপেক্ষা করে সাফল্যের গল্প বললে, এক সময় সেই গল্পই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই প্রশ্ন করেন আগে তো হাম দেখা যেত না, এখন কেন? আসলে আগে হাম ছিল, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে ছিল। কারণ, তখন টিকাদানের হার ছিল উচ্চ এবং জনসংখ্যার বড় অংশ সুরক্ষিত ছিল। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’। কিন্তু যখন টিকাদানের হার কমে যায়, তখন সেই সুরক্ষা ভেঙে পড়ে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে টিকাদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে, মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। পরবর্তী সময়ে সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এই সংকটের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা। যখন তা ব্যর্থ হয়, তখন দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না। প্রায়ই বলা হয়, সচেতনতার অভাব এই সমস্যার একটি কারণ। কিন্তু বাস্তবতা অনেকাংশে ভিন্ন। অধিকাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানকে টিকা দিতে আগ্রহী। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন তারা টিকাকেন্দ্রে গিয়ে টিকা পান না। একাধিকবার ফিরে আসার সুযোগ বা সামর্থ্য সবার থাকে না। ফলে দায় শুধু জনগণের ওপর চাপানো, বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি সহজ উপায়।
অন্যদিকে, অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর। একটি খাতে সংকট তৈরি হলে, তার প্রভাব অন্য খাতেও পড়তে পারে। সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা পুরো টিকাদান কাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের নিজস্ব টিকা উৎপাদনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু টিকা উৎপাদন একটি ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিনিয়োাগ দাবি করে। এখনো সেই সক্ষমতা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তবে সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নিজস্ব টিকা উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে। হামের টিকাদান কর্মসূচি কবে পুরোপুরি পুনরায় শুরু হবে এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি আশ্বাসে বলা হচ্ছে, শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ‘শিগগিরই’ শব্দটি জনস্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বিলম্ব নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ। টিকা সংগ্রহে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। বিতরণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা ভীষণ জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে, এই সংকট বারবার ফিরে আসবে। এই জায়গায়ই মূল প্রশ্ন। কারা কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে? তারা কি চিহ্নিত হবেন? তাদের শাস্তি কি নিশ্চিত হবে! যদি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ভয়ংকর সমস্য আবার জেঁকে বসতে পারে। তখন কোন কর্তৃপক্ষ দায়ী হবেন?
আমাদের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবে এটা নিশ্চিত জানি, বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ও আন্তরিক। এই মুহূর্তে আমরা সেই আন্তরিকাতার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একসময় গর্বের প্রতীক ছিল। সেই গর্ব আজ প্রশ্নের মুখে। এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা বাস্তবতাকে স্বীকার করি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহসী হই। কারণ, একটি শিশুর জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ, একটি সম্ভাবনার প্রতীক। সেই সম্ভাবনাকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে এই ব্যর্থতার দায় ইতিহাস বহন করবে। আর সেই দায় থেকে কেউ মুক্ত থাকবে না।
লেখক
ওষুধ বিশেষজ্ঞ
ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট
আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ
khoshroz@yahoo.com