পানেনকা পেনাল্টি শট: মেসি-রোনালদো থেকে রোনান সুলিভানের দুঃসাহস

ফুটবল ইতিহাসে পেনাল্টি মানেই গোলরক্ষক আর শ্যুটারের স্নায়ুর চরম পরীক্ষা—যেখানে এক মুহূর্তের ভুল হাসির পাত্র বানাতে পারে, আর সাফল্য এনে দেয় অমরত্ব। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে যখন কেউ সাহসিকতার চরম সীমায় নিয়ে গিয়ে শিল্পের রূপ দেন, তখন তাকে বলা হয় 'পানেনকা'। কিংবদন্তি জিদান, পিরলো, মেসি কিংবা রোনালদোর মতো মহাতারকারা এই শৈল্পিক শটকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই একই সাহসিকতার মশাল হাতে নিয়ে গতকালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফাইনালে রোনান সুলিভান বা অতীতে আলেক্সিস সানচেজরা টাইব্রেকারে জয়সূচক পানেনকা কিকে ছিনিয়ে এনেছেন ঐতিহাসিক শিরোপা। এই শটের জন্মদাতা আন্তোনিন পানেনকার সেই রোমাঞ্চকর আবিষ্কার থেকে শুরু করে আধুনিক ফুটবলে এর প্রভাব—সব মিলিয়ে পানেনকা এক চিরকালীন বিস্ময়ের নাম।

আন্তোনিন পানেনকার ‘বিয়ার ও চকোলেট’ বাজি

১৯৭৬ সালের ইউরো কাপের ফাইনাল। চেকোস্লোভাকিয়ার আন্তোনিন পানেনকা পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক সেপ মেয়ারের মুখোমুখি। টাইব্রেকারে পানেনকা নিলেন এক অদ্ভুত শট—জোরে না মেরে আলতো করে বলের নিচে চিপ করলেন, বলটি গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে জালের মাঝখানে গিয়ে পড়ল। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল ফুটবলের নতুন এক জাদু।

পানেনকা পরে জানিয়েছিলেন, তিনি অনুশীলনের সময় গোলরক্ষক বন্ধুর সাথে বিয়ার এবং চকোলেট বাজি ধরতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, পেনাল্টি নেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে গোলরক্ষকরা যেকোনো এক দিকে ঝাঁপ দেন। তাই তিনি যদি বলটি একদম মাঝখান দিয়ে আলতো করে মারেন, তবে গোল হওয়ার সম্ভাবনা ১০০%। দুই বছর কঠোর অনুশীলনের পর তিনি সেই শটটি নিখুঁত করেন এবং ১৯৭৬-এর ফাইনালে সেটি প্রথমবার বিশ্বকে দেখান।

পানেনকা গোলের আবিষ্কারক আন্তোনিন পানেনকা নিজেই গোল করছেন

ফাইনালে পানেনকা, সেই চার দুঃসাহসী বীর

যাদের পানেনকা গোলে দল জিতেছিল শিরোপা-

আন্তোনিন পানেঙ্কা (১৯৭৬ ইউরো): পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে এই শিল্পের সূচনা করেন।

আলেক্সিস সানচেজ (২০১৫ কোপা আমেরিকা): আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টাইব্রেকারে শেষ শটটি ছিল পানেঙ্কা। চিলিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম শিরোপা এনে দেন তিনি।

দানি কারভাহাল (২০২৩ নেশনস লিগ): ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে জয়সূচক গোলটি পানেনকা কিকে করেন এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।

রোনান সুলিভান (২০২৬ সাফ অনূর্ধ্ব-২০): ভারতের বিপক্ষে মালের ফাইনালে টাইব্রেকারে শেষ শটটি পানেঙ্কা কিকে নিয়ে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতান তিনি।

চার মহাতারকার পানেনকা উপাখ্যান

জিনেদিন জিদান: বার্লিনের সেই হিমশীতল সাহস (২০০৬)
বিশ্বকাপ ফাইনাল, প্রতিপক্ষ ইতালির অপরাজেয় গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিট। জিনেদিন জিদান পেনাল্টি নিতে এলেন। পুরো বিশ্ব ভাবছে তিনি হয়তো কোনো কোণ দিয়ে জোরালো শট নেবেন। কিন্তু জিদান করলেন অবিশ্বাস্য এক কাজ। বুফনকে একদিকে পাঠিয়ে আলতো করে বলটি চিপ করলেন। বলটি ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ভেতরে পড়ে আবার বেরিয়ে এলো। রেফারি গোলের বাঁশি বাজালেন। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বুফনের মতো গোলরক্ষকের বিপক্ষে এমন 'পানেনকা' করার দুঃসাহস কেবল জিদানেরই ছিল।

জিনেদিন জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে

আন্দ্রেয়া পিরলো: ইংলিশদের আত্মবিশ্বাস চূর্ণ (২০১২)
ইউরো ২০১২-এর কোয়ার্টার ফাইনাল। টাইব্রেকারে ইতালি তখন পিছিয়ে। ইতালিয়ান মিডফিল্ডার আন্দ্রেয়া পিরলো এলেন শট নিতে। সামনে ইংল্যান্ডের জো হার্ট গোললাইনে লাফালাফি করে পিরলোকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। পিরলো দৌড়ে এসে কোনো শক্তি প্রয়োগ না করে বলের নিচে আলতো টোকা দিলেন। বলটি মাঝ আকাশ দিয়ে ধীরগতিতে গিয়ে জালের মাঝখানে আছড়ে পড়ল। জো হার্ট ততক্ষণে ডানে ঝাঁপ দিয়ে ফেলেছেন। পিরলোর সেই এক পানেনকা পুরো ইংল্যান্ড দলের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল এবং ইতালি ম্যাচটি জিতে নেয়।

আন্দ্রেয়া পিরলোর পানেনকা গোল

লিওনেল মেসি: ৭০০তম গোলের মাইলফলক (২০২০)
লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার পানেনকা করেছেন, তবে ২০২০ সালে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে গোলটি ছিল বিশেষ। সেটি ছিল তার পেশাদার ক্যারিয়ারের ৭০০তম গোল। ইয়ান ওবলাকের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে মেসি যখন মাঝখান দিয়ে পানেঙ্কা করলেন, ওবলাক কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলেন। মেসির পানেনকাগুলো সবসময়ই হয় নিখুঁত এবং শান্ত মাথার প্রতিফলক। পানেঙ্কার জনক আন্তোনিন পানেনকা নিজেও একবার বলেছিলেন, "মেসিকে দেখে গর্ব হয়, ও আমার পেনাল্টি কপি করে।"

পানেনকা গোলে মেসির ৭০০তম

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: নব্বই মিনিটের 'মেন্টালিটি মনস্টার' (২০২৪/২৫)
রোনালদো সাধারণত তার পেনাল্টিতে গায়ের জোর এবং নিখুঁত দিক পরিবর্তনের জন্য পরিচিত। কিন্তু ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসেও তিনি তার শৈল্পিক সত্তা জানান দিচ্ছেন। ২০২৪ সালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে নেশনস লিগে এবং ২০২৫ সালে আল নাসরের হয়ে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগে তিনি 'ফ্ললেস' পানেনকা করেছেন। রোনালদোর পানেনকা প্রমাণ করে যে, যখন সবাই তার চিরচেনা পাওয়ারফুল শটের অপেক্ষায় থাকে, তখনই তিনি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে পারেন।