বিদ্যুৎ রেশনিং

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৬টার পর দোকান-শপিংমল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু সেই নির্দেশনা মানেনি তারা। ব্যবসায়ীরা চান, বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান-শপিংমল খোলা রাখতে। এই সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গত শুক্রবার এই অনুরোধ জানায় সমিতি। তাদের সেই অনুরোধ প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন কি না, তা জানা না গেলেও; বোঝা যায়, ব্যবসায়ীদের অনুরোধ বিবেচনা করতে পারে তার সরকার। গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর মিরপুর, নিউ মার্কেট,  ফার্মগেট এলাকার অধিকাংশ দোকান খোলা রাখতে দেখা গেছে। সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত, তারা এ নিয়ে দ্বিধায়। ঈদ-পরবর্তী সময়ে ব্যবসার গতি ধরে রাখতে, তারা নিজেরাই ওই নির্দেশনা মানেনি। উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সংকট সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ খাতে রেশনিং করতে চাইছে। মূল লক্ষ্য বিদ্যুতের ঘাটতি যাতে না হয়, কৃষিতে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকে তা নিশ্চিত করতে এই নির্দেশনা। জ্বালানি সংকটে পড়ে সরকারকে এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

সংকটের ভাগিদার দেশের ব্যবসায়ীরাও, এটা বুঝতে হবে। তারা যদি সাশ্রয়ের বিষয়ে অংশীদারত্ব না নেন, তাহলে সরকারের একার পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা কঠিন। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মুখে অফিসের সময় কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ মানা হচ্ছে না। জ্বালানি সংকট শুধু আমাদের নয়, এ সংকট বৈশ্বিক। বিশ্বের অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানি নিয়ে নাস্তানাবুদ। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী মহলের কী ভূমিকা নিতে হবে, সেটা তাদের বুঝতে হবে। কেন না, তারা জ্বালানি সংকটের বাইরে নয় তারা রাজনৈতিক সরকারের কল্যাণচিন্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম খাত ব্যবসা-বাণিজ্য। সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপে তাদেরও সহযোগ দেওয়া জরুরি। পণ্য-উৎপাদন শুরু, দোকান খোলার সময়ের চেয়ে উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি জরুরি। তার জন্য আরও জরুরি জ্বালানি। জ্বালানি ঘাটতিকে মেনে নিয়ে ব্যবসার স্বার্থ কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে।

আমাদের দেশে মানুষ ভাবেন, সরকারের সব দায়দায়িত্ব। জনগণও যে সরকারের কাজে সাড়া দিয়ে কল্যাণ ও অগ্রগতিতে শক্তি জোগাতে পারে, এই ধারণা অনেকের মধ্যে নেই। এই ত্রুটি সরকারের। কারণ সরকার ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে এই বোধের উন্মেষ ঘটাতে পারেনি। সব বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে, সময় ও সুযোগ সৃষ্টির জন্য তারা বাদ সাধবে না। নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ যেমন সরকারকে ভাবতে হবে, তেমনি জনগণকেও সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি যৌক্তিক সায় দিতে হবে। পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে গতি আনতে হলে, সামান্য কয়েক ঘণ্টা দোকান ও শপিংমল বন্ধ রাখলে, তেমন ক্ষতি হবে না। আমরা জানি, গত ঈদ  মৌসুমে কী পরিমাণ লাভ করেছেন তারা। সামনের বৈশাখী উৎসবকে কেন্দ্র করেও, ভালো ব্যবসা করতে পারবে। মাঝখানে কয়েক দিনের এই রেশনিং আমাদের বুরো ধানের উৎপাদন মৌসুমকে সাহায্য করতে পারে। ধানের উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য হলেও নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা ক্ষতিকর নয়। সরকারের উচিত, ব্যবসায়ীদের বোঝানো যে, এই সংকট সাময়িক এবং তাদের দায়িত্ব রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে অচিরেই। আশা করি, ব্যবসায়ীরা বিষয়টি বুঝবেন।