উচ্চ ফলনশীল চিকন ধান ‘জিএইউ ধান-৪’ উদ্ভাবন

স্বল্পমেয়াদি, উচ্চ ফলনশীল এবং চিকন আউশ ধানের নতুন জাত ‘জিএইউ ধান-৪’ উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা। প্রায় এক দশকের গবেষণা ও পরীক্ষার পর সম্প্রতি জাতটি অনুমোদন পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই জাত কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গতকাল শনিবার সকালে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রনি ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন। গাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক  এম ময়নুল হক ও অধ্যাপক মো. মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষক দলটি এ জাত উদ্ভাবন করেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারটিতে এবং মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৫টি।

বাংলাদেশে আউশ ধানের ফলন সাধারণত আমন ও বোরো মৌসুমের তুলনায় কম। তবে নতুন এ জাত সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। ‘জিএইউ ধান-৪’ স্বল্পসময়ের মধ্যে পরিপক্ব হয়। ফলে কৃষকরা দ্রুত জমি খালি করে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পান। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় এ জাত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত আউশ ধান ‘পারিজা’ ও উচ্চ ফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান-২’-এর সংকরায়নের মাধ্যমে এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। দীর্ঘ গবেষণা ও নির্বাচনের মাধ্যমে জিএইউ-৯৯৭৪-৫২-৭-২ লাইনটি থেকে কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা শেষে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় ‘জিএইউ ধান-৪’ নামে জাতটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন এ ধান পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ফলে এটি সহজে হজমযোগ্য এবং মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়ক। গাছের দানা লম্বা ও চিকন। বীজ বপনের ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল কাটা যায়। অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, যা কৃষকদের জন্য ব্যয় সাশ্রয়ী।

গবেষকরা জানান, এ জাতটি রোগবালাই প্রতিরোধী এবং সাধারণ জাতের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। পাশাপাশি কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় এটি জলবায়ু সহনশীল ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষযোগ্য। চাষাবাদের ক্ষেত্রে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বীজতলায় বপন উপযুক্ত সময়। ২০ থেকে ২২ দিনের চারা কাদা জমিতে রোপণ করতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

অধ্যাপক মো. মসিউল ইসলাম বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি আউশ ধান উদ্ভাবন করা, যা কম সময়ে বেশি ফলন দেবে এবং বাজারে গ্রহণযোগ্য হবে। ‘জিএইউ ধান-৪’ সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ উদ্ভাবন গবেষকদের নিষ্ঠা ও মেধার প্রতিফলন। এটি দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।