ব্যয় বাড়িয়ে একনেকে উঠছে ‘এমপি প্রকল্প’

বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সভায় আওয়ামী লীগ আমলে ‘এমপি প্রকল্প’ নামে পরিচিত ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্প আবার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৪৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিরোধকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভা এই প্রকল্পসহ ১৭ প্রকল্পে উত্থাপনের কথা রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৭৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার অর্থায়ন করবে ৮ হাজার ৭০৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে দুই হাজার ৮৫৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

সভায় উত্থাপিত প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে সাতটি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে অনুমোদন পাওয়া ৯ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এসব প্রকল্পের একটি হলো ২০২২ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্প।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮২ কোটি টাকা, প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। আওয়ামী লীগ সরকার এমপিদের নিজ এলাকার ধর্মীয় স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। প্রকল্পের আওতায় সার্বজনীন অবকাঠামো যেমন কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা এবং ঈদগাহ ইত্যাদির অবকাঠামোগত উন্নয়ন-সংস্কার-মেরামত-প্রাচীর নির্মাণ প্রভৃতি ছিল। শুরু থেকেই এমপিদের অপব্যবহারের কারণে নানা বিতর্কের জন্ম দেয় এই প্রকল্প। তখন থেকেই এটি ‘এমপি প্রকল্প’ নামেই পরিচিতি পায়। আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মাধ্যমে এমপিরা নিজেদের মতো করে মসজিদ, মন্দির এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নেতাদের নিজস্ব কবরস্থানের উন্নয়নও করেছিলেন। অনেক জায়গায় কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানপরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রকল্পের আগের বকেয়াগুলোও গত অর্থবছরে আগাম দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সমাপ্ত হতে যাওয়া এই প্রকল্পে নতুন করে ব্যয় ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এলজিইডি বলছে, চলমান প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি এলজিইডির ২০২০-২১ অর্থবছরের দর তালিকা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল। এরপর নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর ও শ্রমিকের মজুরি বহু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য ২০২২ সালের জুনে এলজিইডির বিভাগীয় দর তালিকা একবার সংশোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেটি আরও হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে বছরভিত্তিক প্রকৃত খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা ভাতা ঘোষণার কারণে নতুন ইকোনমিক সাবকোড অন্তর্ভুক্ত করাও সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু ১ম সংশোধনী প্রস্তাবে এই বিতর্কিত ব্যয় ও পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানায় পরিকল্পনা কমিশন। এই বিতর্ক এবং প্রকল্পের নানা জটিলতা নিয়েই নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভায় এ প্রকল্প উঠছে বলে জানা গেছে।

নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভার জন্য প্রস্তুত করা খসড়া বিবরণীতে দেখা গেছে, প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির এলাকাভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি ৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়, আর সবচেয়ে কম মেহেরপুরে দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।

আইন অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি যে কোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। আইএমইডির তথ্যমতে, এই প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। আইএমইডির এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু কাজের প্রাক্কলন সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।

আইএমইডি তাদের সুপারিশে উল্লেখ করেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিরোধ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমজাতীয় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ প্রকল্পের চলমান কাজ শেষ করে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে প্রকল্পটি ৭০০ কোটিতেই শেষ হয়ে যেত। নতুন সরকার এসে প্রকল্পটির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হতে পারে। বন্ধ হতে যাওয়া একটি প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সরকার চেয়েছে, তাই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।