ক্ষমতার বিএনপিকে স্বস্তি না দেওয়ার আয়োজন স্পষ্ট। দুই মাস পার হয়নি বিএনপির। এরই মধ্যে দলটিকে বেহুঁশ বলতে শুরু করে দিয়েছে তাদের এক সময়ের মিত্রশক্তি। জামায়াত-এনসিপির ১১ দলীয় জোট গণভোটের রায় না মানলে, এই সরকারকে তারা সেদিন থেকেই ‘অবৈধ সরকার’ বলা শুরু করবে। মানে অবৈধ বলার সূচনা করে দিয়েছে। তারা সময় দিতে নারাজ। আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে, আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়া হয়েছে এনসিপি থেকে। তাদের অভিযোগ কড়া। দাবি করা হয়েছে, যেসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, সেগুলো রাখা হচ্ছে; কিন্তু যেসব অধ্যাদেশে জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয় আছে, সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা চারটি অধ্যাদেশ বাতিল ও ১৬টি সংশোধনে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশে ক্ষুব্ধ আরও কেউ কেউ। সুশাসনের জন্য নাগরিক-(সুজন) থেকে বলা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট বরখেলাপ। তাদের কড়া যুক্তি, যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল ও ১৬টি অনুমোদনের বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুটি ও দুর্নীতি দমন কমিশনসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ। এর মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘাড় মটকে দেওয়া হচ্ছে।
জুলাই নিয়ে জামায়াত-এনসিপির এমন যাত্রার ভর মৌসুমে, জাতীয় সংসদে উপস্থিত জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধাদের খোঁজখবর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার সংসদ অধিবেশন চলাকালে, মাগরিবের নামাজের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী মেঘনা গ্যালারিতে যান। এ সময় তিনি প্রত্যেকের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের কথা শোনেন। ২৬ জন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন সেখানে। ছিলেন জুলাই গণআন্দোলনে আহত ৩০ জনের বেশি যোদ্ধা। তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে, নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীও বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে, একে একে সবার কথা শোনেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সামনে কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে ও কাঁধে হাত রেখে, সান্ত্বনা দেন তারেক রহমান। তখন সেখানে ভিন্ন এক আবহ। জুলাই ঝুলিয়ে রাজনীতির বাতাবরণ উপেক্ষার সুযোগ নেই। এর আবেদন অস্বীকার করার মতো নয়। আবার জুলাই নিয়ে রাজনৈতিক দোকানদারি-ঠিকাদারির লোকেরও অভাব নেই। ওয়াদা-অঙ্গীকারের কত যে ছড়াছড়ি। অথচ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি সংসদে। তা ক্রমশ রাজপথে গড়ানোর নমুনা। যে যার অবস্থানে অনড়। বিএনপি বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, সেটা তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে। তারা সে অনুযায়ী, সংসদে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল বিদ্যমান সংবিধানের সংস্কার চায়। সংবিধানের ওই জায়গাগুলো পরিবর্তন চায়, যেগুলো গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। যুক্তিতে উভয়ই কড়া। সংসদ গরম। বিএনপির পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিতর্কে বলেছেন, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, এমন বিধান বিএনপি প্রস্তাব করেছিল তারেক রহমানের নির্দেশে। কারণ, তারা চান না ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাচার, সংসদীয় স্বৈরাচারের উৎপত্তি হোক। তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সই হয়েছে, বিএনপি সেই জুলাই সনদের সব দফা, অঙ্গীকারনামা শতভাগ পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সময় তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ (ছদ্মবেশী আইন) হিসেবে আখ্যা দেন।
তার অভিযোগ সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল বিলুপ্তির প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু পরে সপ্তম তফসিলের বিষয়টি সনদে রাখা হয়নি। ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন’ যুক্ত করা, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানানোর বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু এগুলো সনদে রাখা হয়নি। তিনি বলেন, বিএনপি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংবিধান সংস্কার হয় না; সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয়, সংশোধন হয়, বাতিল হয় এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কায়েমের জন্য এই সংবিধানের পরিবর্তন চেয়েছেন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ ও শাসন পাওয়ার লড়াই থেকে তারা পিছু হটবেন না। তাই কোনো বিতর্ক ছাড়াই গণভোট মেনে নেওয়ার দাবি তার। কিন্তু বাস্তবতা কেবল বিতর্ক নয়, আরও বেশি কিছুতে গড়াচ্ছে। কথায় কথায় খুঁত ধরা, খোঁচা দেওয়ার এক ধুম পড়েছে। তা করতে গিয়ে কেউ কারও ইজ্জত রাখছেন না। নানা তিতা কথা নিয়ে আসা হচ্ছে সামনে। সংবিধান, চেতনা, মর্যাদা লাটে ওঠার অবস্থা। সেই সঙ্গে নতুন নতুন তত্ত্ব, নিজেকে জাহিরসহ জ্ঞান বিতরণের ধুম। সংবিধান সংস্কার করা যায় না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের এমন দাবি নিয়ে ট্রলের হিড়িক। বলা হচ্ছে : ৩১ দফা আর দলীয় ইশতেহারে বিএনপি তাহলে কেন ‘সাংবিধানিক সংস্কারের’ কথা বলেছিল? ৫১ শতাংশ কি ৭০ শতাংশের চেয়ে বড় এ প্রশ্ন সামনে এনে বাজার গরম করার চেষ্টা ধাবমান। সংবিধানে সংসদকে ‘সার্বভৌম’ বলা হয়েছে এমন দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এনসিপি থেকে বলা হয়েছে: বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও সংসদকে সার্বভৌম বলা হয়নি। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ এবং জনগণের অভিপ্রায়ের সাপেক্ষে সংবিধানের প্রাধান্য বিরাজ করবে। এ ছাড়া অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী, সংসদকে অবশ্যই সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন করতে হবে; সংবিধানের স্পিরিটের পরিপন্থী কোনো আইন সংসদ করতে পারে না। আরও কিছু বিষয়কে সামনে এনে বিএনপিকে ঘায়েলের ধুম বইছে। দলীয় ইশতেহারে বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান, সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত রাখার কথা বলেছে। সুপ্রিম কোর্টের একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। সেসব কথা সামনে এনে দলটির ঘাম ছুটিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে কোনো সময় বা ছাড় না দেওয়ার মনমগজের কাজ প্রকাশ্যে চলমান। মসনদে ক্ষমতাসীন সরকারকে জুলাই সনদ ও গণভোটের বিপক্ষ শক্তি প্রমাণের আয়োজনে, ঢের এগিয়ে চলছে।
একদিকে সংসদে সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ, আরেকদিকে রাজপথে কর্মসূচি। সরকারেরও শক্তপোক্ত অবস্থান। তারা সনদ বিরোধী নয়, গণভোট বিরোধীও নয়। কিন্তু, কাশিটা দিচ্ছে খুসখুস করে। ঝেড়ে কাশি না দিয়ে বয়ানের নমুনায় গোলমাল পাকছে। বাঁধছে ভজঘট। জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশকে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণা হিসেবে। সরকার পক্ষের বয়ানের তেজের সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী দল। বলার চেষ্টা করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার পদক্ষেপগুলো বাতিলের উদ্যোগ নিয়ে, এই সরকারও শেখ হাসিনা সরকারের মতো ফ্যাসিবাদী পথ ধরেছে। এ প্রবণতার মধ্য দিয়ে জনরায় আর জনরোষের একটা বাতাবরণ বইয়ে দিতে পারছে তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বেশ কিছু বাদ দিচ্ছে সরকার পক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে, প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে, বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। সেই কমিটির প্রতিবেদন দৃষ্টে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, গণভোট অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে অনুমোদন করা হচ্ছে না। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। অন্য ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আলোচনা ও বাহাস এখন আর সেখানে নেই। ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার’ চিন্তার ভর দুদিকে। এতে কারও একতরফা জেতার বাস্তবতা নেই। বিষয়টি হতাশার। উদ্বেগও ঘুরছে।
বিতর্ক, মতবিরোধ সব সময় খারাপ নয়। সমস্যা দেখা দিয়েছে, ভাবভঙ্গি নিয়ে। উপলব্ধি, আচরণে সহাবস্থান থাকলে শেষ পর্যন্ত সব সমস্যা সমাধানযোগ্য। তখন কোনো কমিটি, কমিশন লাগে না। এ ছাড়া সবে ক্ষমতায় আসা একটি দলকে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সময় দরকার। সংসদ, সংবিধান, কমিটির বাইরে অনেক কিছু হয়, হয়েছে। সামনেও হতে পারে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ‘পোস্টভ্যালিডিটি’ বা পরবর্তী বৈধতা দেওয়ার নজির রয়েছে যেমন পঞ্চম, সপ্তম বা একাদশ সংশোধনী। প্রয়োজনে এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ধরনের পদক্ষেপকে, বৈধতা দেওয়া সম্ভব। সুতরাং বিষয়টি কেবল আইনগত ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশাও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের বাস্তবতায় জ্বালানি সংকটে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। সামনে বাজেটও প্রাসঙ্গিক। হামে অবিরাম শিশুমৃত্যুও কম প্রাসঙ্গিক নয়। সামনে আবার কোন ভাইরাস দেশকে আক্রমণ করবে, কে জানে!
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com