বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরমে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম আজ মঙ্গলবার রাতে শেষ হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইরান প্রণালিটি খুলে দেওয়ার চুক্তিতে না এলে দেশটিতে ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালানো হবে। তবে এই যুদ্ধের হুমকির মধ্যেই নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ তেহরানের সঙ্গে আলাদাভাবে সমঝোতা শুরু করেছে।
গত সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানান, মঙ্গলবার গ্রিনিচ সময় মধ্যরাতের মধ্যে ইরানকে অবশ্যই একটি চুক্তিতে আসতে হবে। অন্যথায় ‘এক রাতেই’ ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে, তখন থেকেই এই অঞ্চলটি বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও ইতোমধ্যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে তেহরানের সঙ্গে সফল আলোচনা করেছে। ফিলিপাইন তাদের মোট জ্বালানির ৯৮ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ফলে দেশটিতে তেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় তারা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো নিশ্চিত করেছেন যে, ইরান তাদের পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে ‘নিরাপদ ও বাধাহীন’ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
পাকিস্তান গত ২৮ মার্চ ইরানের কাছ থেকে ২০টি জাহাজ চলাচলের বিশেষ অনুমতি আদায় করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই পদক্ষেপকে গঠনমূলক বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ভারতও তাদের ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমর্থ হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত ইরান দূতাবাস থেকে সামাজিক মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, ‘ভারতীয় বন্ধুরা নিরাপদ রয়েছে’। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও জানিয়েছেন, কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই সংকটের মধ্যেও ভারতীয় জাহাজগুলোর যাতায়াত সম্ভব হচ্ছে।
চীন এবং মালয়েশিয়াও এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে চলেছে। চীন সরকার নিশ্চিত করেছে যে, গত সপ্তাহে তাদের তিনটি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও তাদের ট্যাংকারগুলোকে পথ ছেড়ে দেওয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব খণ্ডকালীন সমঝোতা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের শঙ্কা কাটেনি।
শিপিং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ইরান বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিলেও সার্বিক নিরাপত্তা এখনো অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে দেশগুলো সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তবে ট্রাম্পের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।