মনোনয়ন না দেবার জন্য বিএনপিকে ধন্যবাদ জানালেন রুমিন

সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বিএনপি থেকে বহিস্কৃত রুমিন ফারহানা বলেছেন, আমি প্রথমত বিএনপিকে  ধন্যবাদ জানাই মনোনয়ন না দেবার জন্যে।  কেননা, আমাকে মনোনয়ন না দেয়ার কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কত লক্ষ মানুষের ভালোবাসা, দোয়া, সহযোগিতা আমার পাশে ছিল। 

একটা দলীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে নির্বাচন করলে এইটা বুঝবার সৌভাগ্য আমার হতো না।
 মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষনের ওপর দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময়  ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদে সভাপতিত্ব করছিলেন।

রুমিন বলেন,  বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে আর সকল কিছুই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কি পরামর্শ দিলেন সেই ব্যাপারেও কোথায় কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। সে কারণে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনবার ব্যাপারে বারবার আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল ২৪এর অভ্যুত্থানের আগে পরে সকল সময় বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হোক। বিএনপি তার ভিশন ২০৩০ এবং ৩১ দফাতেও এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছে। 

তিনি বলেন,  সে কারণেই সঙ্গতভাবে আমাদের একটা এক্সপেক্টেশন ছিল যে এইবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ভাষণের বাইরে গিয়ে তার নিজের মতন করে ভাষণ দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম এইবারও রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত একটি ভাষণ তাকে দিতে হলো। 

আমরা যদি এতটুকু স্বাধীনতা  রাষ্ট্রপতিকে দিতে না পারি তাহলে আর আমরা কোন ভারসাম্যের কথা বলছি? গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে যার পরিমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার সেটি ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ৬ লক্ষ কোটি টাকার খেলাফি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের কোন পরিবর্তন কাজে আসবে না। গত ১০ বছরে ওভার এন্ড আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৮ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং এই মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচারও বন্ধ সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রয়ত্ব ও বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক তদারুকী, উন্নতকরণ, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত, খেলাফিঋণ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছেন। 

যেকোনো দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি সরকারের ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রিন্স্টন বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি করা উচ্চ ডিগ্রিধারী মানুষজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকজন নিয়োগ পেয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর যিনি নিয়োগ পেয়েছেন তিনি হলেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং একজন সোয়েটার ফ্যাক্টরির এমডি। 

একই ঘটনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখেছি। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি প্রভিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দল করা দূষণীয় কিছু নয়। কিন্তু দল না করলে যদি নিয়োগ না হয় সেটা দুর্ভাগ্যজনক। দলদাস শিক্ষকদের হাতে।

রুমিন বলেন, আমি খুব বিনয়ের সাথে বলি এই আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন নারীরা। একঝাক নতুন প্রজন্মের তরুণ মুখ আমরা পেয়েছিলাম। সেই নারীরা এক বছর পার না হতেই হারিয়ে গেলেন কেন? সাতজন নারী সাংসদের এই সংসদে সেই প্রশ্নটা আমি আপনাদের কাছেই রেখে যাচ্ছি। মিছিলের সামনের শাড়িতে নারীর প্রয়োজন হয়। পুলিশের টিয়ারশেল লাঠি চার্জের সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অস্থির সময় নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না। আর সবকিছু যখন ঠিক হয় তখন নারী হয়ে ট্রোলের বস্তু নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি সবকিছুই তখন হাসির মোহরাকে পরিণত হয়। মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার মাধ্যমে আজকের সংসদে আরেকটি কথা বলে যাই। ৫২ শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোন চিন্তা যদি কেউ করে থাকে সেটা কখনো সম্ভব না। কোনদিন সম্ভব না।

তিনি বলেন, হাজার মানুষের আত্মত্যাগের ফসল হচ্ছে আজকের এই সংসদ। এই মানুষগুলো কারা? তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজকে কেউ মন্ত্রী, কেউ এমপি, কেউ সরকারি দল, কেউ বিরোধী দল হয়ে এসে সংসদে বসেছি।  তাদের স্বপ্ন কি ছিল? তারা জানতো তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে তারা কিন্তু কেউ মন্ত্রী হবে না। এমপিও হবে না। তারা ছিল সাধারণ মানুষ একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের। তারা একটা স্বপ্ন দেখেছিল। একটা নতুন বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন, একটা নতুন রাজনীতি নির্মাণের স্বপ্ন, একটা নতুন চিন্তার জন্ম দেয়ার স্বপ্ন এবং সর্বোপরি সকলের জন্য যেই ভীষণ রকম বৈষম্য আমরা দেখেছি গত কয়েক বছর সেখান থেকে মুক্ত হয়ে সকলকে নিয়ে সকলকে একসাথে করে একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন, সেই সকল মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

রুমিন বলেন,  শহীদদের যে প্রত্যাশা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান সেই প্রত্যাশা কিন্তু বায়োবীয় বা অলিক কোন বিষয় ছিল না, এখনো যদি আমরা দেয়ালে দেয়ালে তাকাই আমরা দেখব তারা তাদের স্বপ্নের কথা দেয়ালে লিখে গেছে। উই ওয়ান্ট জাস্টিস কিংবা দেশটা কারো বাপের না। তুমি কে আমি কে বিকল্প বিকল্প আসছে ফাগুন আমরা হব দ্বিগুন। শোন মহাজন আমরা অনেকজন চেঞ্জ ভয়েস নট ইকো দিনে নাটক রাতে আটক নাটক কম কর প্রিয় হামাক প্যাটাক মারল কেন? প্রশ্ন লক্ষ্য জিজ্ঞাসা এই লড়াইটা কেবল একটা সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না। 

তিনি বলেন, যেই কথাটি আমি বলেছি একটা স্বপ্ন একটা নতুন বাংলাদেশ সকলকে নিয়ে গঠন করবার একটা স্বপ্ন নিয়ে এই গণঅভুত্থান হয়েছিল। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী বা লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপর বা আদার করে দেয়া হবে না।  

রুমিন বলেন, রাষ্ট্রপতি ভাষণের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.৪৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উৎপাদন বাড়ছে কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং উৎপাদন ও সেবা খাতগুলোকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়। সেই দুই খাতেই কর্মসংস্থান চলছে। একে চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি বলে যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ঝুঁকি। দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে দক্ষতার অভাব এবং ভাষাগত দুর্বল কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হচ্ছে অন্য লোক নিয়োগ দিতে। অর্থাৎ কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার যেখানে ৩.০১ শতাংশ সেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে এটি ৮.৭ শতাংশ। ভাষণের ছয় নম্বর প্যারায় মূল্যস্ফীতির কথা বলা আছে।

উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর লাল তালিকায় অলরেডি বাংলাদেশের নাম গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্নবৃত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। যাদের মোট আয়ের দুই তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত খাবার কিনতেই চলে যায়। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি দারিদ্র বাড়ায়, পুষ্টিহীনতা তৈরি করে। এবং আগামী প্রজন্মের মেধা বিকাশে সরাসরি প্রভাব রাখে।  তিনি বলেন, গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ সেটা দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৮ বিলিয়ন ডলার বলে ঘোষণা করেছেন। 

এই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত হলো পোশাক রপ্তানি। এরপর আছে প্রায় এক কোটি প্রবাসীর পাঠানো রেমিটেন্স, বৈদেশিক ঋণ, ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই, বৈদেশিক অনুদান ইত্যাদি। সম্প্রতি সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। তাই এখন থেকেই আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্ত না হলে এই চাপ সামাল দেওয়া সত্যিই কঠিন। পাশাপাশি হুন্ডি ও অর্থপাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন রুমিন