যুদ্ধে গতি কমেছে উৎপাদন-নির্মাণে

ইরান-ইসরাইলে যুদ্ধ, সঙ্গে ঈদের দীর্ঘ ছুটি দুইয়ের প্রভাবে মার্চ মাসে দেশের অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন ও নির্মাণশিল্প খাতে নেমে এসেছে মন্দা। কৃষি খাতেও কমেছে গতি। এর ফলে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান কমেছে। তবে সেবা খাত ছিল কিছুটা ইতিবাচক। গতকাল বুধবার প্রকাশিত পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্সে (পিএমআই) সূচকে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, অর্থনীতির প্রধান খাত কৃষি, ব্যবসা, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতের ৪০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের মতামতের ভিত্তিতে পিএমআই প্রকাশ করা হয়। সূচক তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল ক্রয়, পণ্যের ক্রয়াদেশ, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোতে ব্যবসায়িক পরিবেশ মিশ্র অবস্থায় রয়েছে। রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। সেবা ও খুচরা খাতে উৎসবকালীন চাহিদার কারণে বিক্রি বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে তারা।

উদ্যোক্তারা আরও বলেছেন, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ক্রয়াদেশ কমেছে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী ও ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও ব্যবসায়িক আস্থাকে প্রভাবিত করছে।

জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ উদ্যোক্তা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গত মাসের পিএমআই সূচকগুলো ইঙ্গিত করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হচ্ছে। যা প্রধানত উৎপাদন খাতের মন্দার কারণে হয়েছে। দীর্ঘ ছুটি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এই খাতে প্রভাব ফেলেছে। চলমান সংঘাতের ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘেœর ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা আরও দুর্বল করেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’

মূলত পিএমআই শূন্য থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে পরিমাপ করা হয়। সূচকের মান ৫০-এর বেশি হলে অর্থনীতির সম্প্রসারণ ও ৫০-এর নিচে হলে সংকোচন বোঝায়। পিএমআই সূচক মার্চ মাসে ছিল ৫৩ দশমিক ৫ পয়েন্ট, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৫৫ দশমিক ৭০। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২ দশমিক ২ পয়েন্ট কমেছে সূচক। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই পয়েন্ট ছিল ৫৩ দশমিক ৯-এ। আর গত ডিসেম্বরে এই সূচকের মান ছিল ৫৪ দশমিক ২ পয়েন্ট। মার্চ মাসে সূচক ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে উৎপাদন খাত ১৮ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণে ছিল। মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো সংকোচনের মুখে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ক্রয়াদেশ ও রপ্তানি হ্রাস, পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, আমদানি কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে পতনের কারণে এই খাতটি চাপের মধ্যে পড়ে। কারখানা উৎপাদন, ইনপুট ক্রয় এবং সরবরাহব্যবস্থার কিছু সূচকে এখনো সম্প্রসারণ বজায় রয়েছে।

অন্যদিকে নির্মাণ খাত টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচন রেকর্ড করেছে। যেখানে নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রমে স্পষ্ট পতন দেখা গেছে। এই খাতের সংকোচনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের ধীরগতি, সতর্ক ক্রেতা আচরণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্বল অর্ডার প্রবাহ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি এই দুই খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ ছুটি ও মৌসুমি প্রভাবও উৎপাদন এবং নির্মাণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে।

তবে পরিষেবা খাত ইতিবাচক। টানা ১৮তম মাসের মতো সম্প্রসারণ রেকর্ড করেছে। মার্চে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়েছে। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, ইনপুট খরচ এবং ক্রয়াদেশ সব সূচকেই সম্প্রসারণ দেখা গেছে।