উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির আবির্ভাব, কোন দিকে মোড় নিচ্ছে পরিস্থিতি?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রলয়ংকরী বক্তব্যে  সতর্ক করেছিলেন, “আজ রাতেই পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে”। এর পর হঠাৎ করেই উত্তেজনা প্রশমনের দিকে মোড় নেয়। 

৭ এপ্রিল সন্ধ্যার মধ্যে ঘোষণা আসে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে; এর কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলও এতে যোগ দেওয়ার কথা জানায়। এই দুই সপ্তাহে স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনা হওয়ার কথা, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে।

এটি আসলে সংঘাতের শুরু থেকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে (এ বিষয়ে পরে বলা হয়েছে), তবে আপাতত মনে হচ্ছে পরিস্থিতি এমন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছে যেখানে পারস্য উপসাগর সত্যিই “পারস্য” হয়ে উঠছে। ইরান এখন কার্যত উপসাগরের নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আরব তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্রগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যেন তা মেনে নিচ্ছে।

পরিস্থিতি ১: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি

ধরা যাক, এই যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর স্থায়ী হয়। এটি সম্ভব—যদিও আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি না-ও হতে পারে, তবুও যুদ্ধবিরতি বারবার বাড়ানো যেতে পারে।

এই ক্ষেত্রে আরব দেশগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার হবে নতুন প্রজন্মের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সস্তা ও ব্যাপকভাবে উৎপাদনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের দিকে তারা ঝুঁকবে। একইসঙ্গে তারা তাদের প্রচলিত প্রতিরক্ষা মজুদও পুনরায় পূরণ করবে।

দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হবে লজিস্টিক ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করা-যেমন লোহিত সাগরের দিকে নতুন পাইপলাইন তৈরি এবং উপসাগরের শিপিং রুটের বিকল্প খোঁজা। লক্ষ্য একটাই: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমানো। 

তবে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকের মতো দেশগুলোর জন্য এটি আবার সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে।

তবুও মূল সমস্যা থেকে যায়। উপসাগরের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ৫০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি বিস্তৃত এই এলাকায় প্রায় সব শিপিং পথই ইরানের নাগালের মধ্যে। উপকূলজুড়ে থাকা বন্দর, কারখানা, তেল সংরক্ষণাগার, ডেটা সেন্টার—সবই ঝুঁকির মধ্যে। ফলে আপাতত আরব দেশগুলো নিরাপদ চলাচলের জন্য অর্থ প্রদান করাকেই বেছে নিতে পারে।

আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিত, এখন হয়তো ইরানকে দেবে। এমনকি এই খরচও খুব বেশি নয়-প্রতি সুপারট্যাঙ্কারে প্রায় ২০ লাখ ডলার, যা বহনকৃত তেলের মোট মূল্যের মাত্র ২-৩%। শেষ পর্যন্ত এই খরচও ক্রেতারাই বহন করবে।

পরিস্থিতি ২: পুনরায় সংঘাত বৃদ্ধি

দুই সপ্তাহ পর আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে-এবং তা আরও তীব্র হতে পারে। তবে এটি তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাব্য, কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে ইরানকে নিশ্চিতভাবে পরাজিত করার স্পষ্ট কোনো পথ নেই।

তাদের সামনে মূলত দুটি বিকল্প আছে:

প্রথমত, ব্যাপক কৌশলগত বোমাবর্ষণ-যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বড় ধরনের পাল্টা আঘাতের কারণ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, স্থল অভিযান-যা উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে আসে এবং বাস্তবে খুব কম ফল দেবে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনও কার্যকর রয়েছে এবং এমন আক্রমণ বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও সৃষ্টি করতে পারে।

পরিস্থিতি ৩: নিম্নমাত্রার সংঘর্ষ (সবচেয়ে সম্ভাব্য)

এটি মূলত প্রথম পরিস্থিতিরই একটি রূপ এবং সবচেয়ে সম্ভাব্য। ইতোমধ্যেই এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে হামলা ও পাল্টা হামলার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে। যেমন-ইসরায়েল হামলা চালায় (অথবা ইরান দাবি করে), এরপর ইরান সাময়িকভাবে প্রণালি বন্ধ করে বা পাল্টা আঘাত হানে।

কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর এই ধরনের ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে-একটি স্থায়ী কিন্তু নিম্নমাত্রার ঝুঁকি হিসেবে। অঞ্চলটি অস্থিতিশীল থাকবে, তবে বিশ্বব্যাপী বড় প্রভাব পড়বে না, যতক্ষণ না পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও অন্যান্য সম্পদ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
সূত্র: আরটি