বাড়ির উঠোনে সাদা কাফনে মোড়া কফিনটি রাখা। চারপাশে মানুষ, কিন্তু নীরবতা ভাঙছে শুধু কান্নার শব্দে। স্ত্রী নয়না আক্তার বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, ছোট ছেলেটি স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে—বুঝে উঠতে পারছে না, কীভাবে তার বাবার ফিরে আসা এমন হলো। আট দিন আগে দুবাইয়ে কর্মস্থলে ছিলেন শাহ আলম ভুঁইয়া। পরিবারের জন্য কোরবানির ঈদে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না জীবিত মানুষের মতো—ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার জিরুইন গ্রামে নেওয়া হলে শোক যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। গ্রামের সরু পথ ধরে যখন অ্যাম্বুলেন্সটি এগোয়, মানুষজন দাঁড়িয়ে পড়ে—শেষবারের মতো দেখতে চায় সেই মানুষটিকে, যিনি বছরের পর বছর বিদেশে কাটিয়েছেন শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে।
বাদ আসর জানাজায় মানুষের ঢল নামে। কেউ সহকর্মী, কেউ প্রতিবেশী, কেউবা দূর সম্পর্কের আত্মীয়—সবাই এসেছেন এক মানুষকে শেষ বিদায় জানাতে, যার জীবনের গল্প খুব সাধারণ, কিন্তু ত্যাগের দিক থেকে অসাধারণ।
গত ১ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরার দিব্বা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে প্রাণ হারান ৪৫ বছর বয়সী শাহ আলম। ঘটনাটি যতটা আকস্মিক, তার চেয়েও বেশি নির্মম—কারণ তিনি কোনো সংঘাতে জড়িত ছিলেন না; ছিলেন কেবল একজন শ্রমজীবী প্রবাসী।
পরিবারের গল্পটাও চেনা—সংগ্রাম আর স্বপ্নের মিশেল। ওমান থেকে শুরু করে দুবাই—দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি চেষ্টা করেছেন সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু সেই চেষ্টার ফল ভোগ করার আগেই থেমে গেল জীবন।
স্ত্রীর কণ্ঠে অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট, এই সংসারটা কীভাবে চলবে? ছেলেদের পড়াশোনা কীভাবে করাব? বড় ছেলে মাদরাসায় পড়ে, ছোটটি এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র—তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
প্রতিবেশীরা বলছেন, শাহ আলম খুব বেশি কিছু জমাতে পারেননি। ছোট্ট ঘর, সীমিত আয়—তারপরও পরিবারের জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন। এখন তার অনুপস্থিতিতে সেই ঘরটাই যেন সবচেয়ে বেশি ফাঁকা।
জানাজা শেষে যখন মাটিচাপা দেওয়া হলো তাকে, তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল পশ্চিমে। গ্রামের আকাশে লালচে আলো, আর মানুষের চোখে অশ্রু—একসঙ্গে মিশে তৈরি করছিল এক নিঃশব্দ বিদায়ের দৃশ্য। শাহ আলমের গল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু রেখে গেছে এক প্রশ্ন—প্রবাসে জীবন বাজি রেখে যারা পরিবার বাঁচানোর চেষ্টা করেন, তাদের নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত?