বিক্রি হচ্ছে ‘আশ্রয়ণে’র ঘর

চকরিয়া উপজেলার গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবায়িত সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেক ঘরেই এখন মূল সুবিধাভোগীরা বসবাস করছেন না। কোথাও ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছে, কোথাও বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। প্রশাসনের তদারকি না থাকায় একটি প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতায় এসব অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। এতে প্রকৃত গৃহহীনদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্পের যে লক্ষ্য, তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চকরিয়ায় চার ধাপে মোট ৮৭৪টি ঘর ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক সূত্রের দাবি, এর মধ্যে প্রায় ৩৫০টির মতো ঘর এরই মধ্যে হাতবদল হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৪০ শতাংশ। এসব ঘর ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি উপজেলার হারবাং, কাকারা, পাহাড়তলী, বদরখালী, ডুলাহাজারা, সাহারবিল ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ঘর নতুন ক্রেতাদের দখলে চলে গেছে, যাদের অনেকেই প্রকল্পের তালিকাভুক্ত নন।

অনুসন্ধানে ঘর হাতবদলের পেছনের নানা কারণ জানা যায়। কিছু সুবিধাভোগী আর্থিক সংকট বা পারিবারিক প্রয়োজনে ঘর বিক্রি করেছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে, নিজস্ব জমি বা বাড়ি থাকার পরও প্রভাব খাটিয়ে ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন; পরে তা বিক্রি করেছেন। এ কারণে প্রকৃত গৃহহীনদের একটি অংশ পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সুবিধাভোগী আবুল বশর বলেন, ঘর পাওয়ার পর কিছুদিন বসবাস করেছি। পরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে দিই।

একই এলাকার খুরশিদা বেগম জানান, স্থানীয় এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ১ লাখ টাকার কিছু বেশি দিয়ে একটি ঘর কিনেছেন। এগুলো যে কেনাবেচা যাবে না, এ বিষয়ে তার জানা নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি এটি অবৈধ হয়, তাহলে দায় কার ওপর বর্তাবে?

চকরিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রাজধানীপাড়া এলাকার মো. করিম নিজের বরাদ্দ পাওয়া ঘর বিক্রির কথা স্বীকার করে বলেন, আমার অন্য জায়গায় বসতবাড়ি থাকায় বাড়িটি বিক্রি করেছি। ক্রেতা ছৈয়দ নুর জানান, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে তিনি মো. করিমের কাছ থেকে জায়গাসহ ঘরটি ক্রয় করেছেন। এ ছাড়া ফাঁসিয়াখালীর নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মো. রাশেদ নামের এক ব্যক্তি একটি ঘর ক্রয় করেন। তার পরিবারের দাবি, বসবাসের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তারা এই ঘর কিনতে বাধ্য হয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রকৃত গৃহহীনদের মধ্যে বঞ্চনার অভিযোগও জোরালো হচ্ছে। সাহারবিল ইউনিয়নের হাজেরা বেগম বলেন, ভূমিহীন হয়েও আমরা ঘর পাইনি। যাদের নিজস্ব জমি আছে, তারা প্রভাব খাটিয়ে ঘর নিয়ে পরে বিক্রি করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ নুরও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসব ঘর বিক্রি ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিত মধ্যস্থতা করে এসব লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চলছে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক ইউপি চেয়ারম্যান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারি ঘর বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। কেউ ব্যক্তিগতভাবে এমন কাজ করলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রি, ভাড়া বা হস্তান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজে বসবাস না করলে প্রশাসন সেই ঘর বাতিল করে পুনরায় প্রকৃত গৃহহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি না থাকায় এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিলীপ দে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপায়ণ দেব বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে ঘর পুনরুদ্ধার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, চকরিয়ায় চার ধাপে ৮৭৪টি ঘর বরাদ্দ  দেওয়া হলেও কতগুলো ঘর প্রকৃতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কতগুলো হাতবদল হয়েছে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রশাসনের কাছে নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরলে বিষয়টি নিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে।

জানা যায়, প্রতিটি সুবিধাভোগী পরিবার দুই দশমিক দুই শতক জমি, দুই কক্ষের একটি আধাপাকা বাড়ি, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, একটি রান্নাঘর, একটি বাথরুম এবং একটি গোসলখানা  পেয়েছে।