যুদ্ধের 'কলাটেরাল ড্যামেজ' বা আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে সাধারণত সত্যের মৃত্যু এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কথা শোনা যায়। তবে এবার এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর ওপর। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হাত মেলানোর সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর ওপর তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন। তার অভিযোগ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায় মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না এবং তারা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের জেরে তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল, যা বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কারণে সাময়িকভাবে শান্ত রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বুধবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। তবে আড়াই ঘণ্টার সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক মোটেও সুখকর হয়নি। ইউরোপীয় একজন কর্মকর্তা এই বৈঠককে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প কেবল অপমানজনক মন্তব্য করেছেন এবং নানা হুমকি দিয়েছেন।
বৈঠকের পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প ক্যাপিটাল লেটারে লেখেন, আমাদের যখন প্রয়োজন ছিল তখন ন্যাটো পাশে ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। গ্রিনল্যান্ডের কথা মনে আছে? ওই বড়, অকেজো বরফের টুকরোটি! যদিও তিনি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, যা মিত্রদের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পরদিন এক ভাষণে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে কিছুটা নমনীয় সুর অবলম্বন করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, ইরান ইস্যুতে সমর্থন দিতে ইউরোপীয় দেশগুলো ‘কিছুটা ধীর’ ছিল। এমনকি ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার’ প্রশংসা করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ন্যাটোর মূল স্তম্ভ ‘পারস্পরিক বিশ্বাসে’ ফাটল ধরিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছেন, ন্যাটো বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। কিন্তু কোনো সদস্য দেশই আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চুক্তিতে সই করেনি। ট্রাম্প মিত্রদের বিরুদ্ধে যে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলছেন, তা ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি বড় বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক চার্লস কুপচান বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ভয় কাজ করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আদর্শবাদী শক্তির বদলে রাশিয়া বা চীনের মতো কেবল ‘রিয়েলপলিটিক’ বা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
ন্যাটো বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন বারজিনা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো যদি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব দেয়, তবে তিনি জোট ত্যাগ করতে পারেন। এতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাঁর মতে, পরিস্থিতি যতই ‘অপ্রীতিকর ও চাপযুক্ত’ হোক না কেন, ইউরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপরিহার্য।
আপাতত ৮০ হাজার মার্কিন সেনা এবং ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সামরিক ঘাঁটির কারণে ট্রাম্প ন্যাটো ত্যাগ করবেন না বলে ধারণা করা হলেও, এই ঐতিহাসিক জোটের ভেতরে নৈতিক ও আদর্শিক ক্ষত গভীর হচ্ছে—তা এখন স্পষ্ট।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান