রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ‘ইনোভেটিভ মডেলিং টেকনিকস ফর কোস্টাল হ্যাজার্ডস অ্যান্ড পোস্ট-ডিজাস্টার ডিজিজ ডায়নামিক্স’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার(১২এপ্রিল)বিশ্ববিদ্যালয়ের জাবির ইবনে হাইয়ান একাডেমিক ভবনের ৩২১ নং কক্ষে দিনব্যাপী এই সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এম. আসাবুল হক। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন এবং অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক এবং সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার ড. গৌড় চন্দ্র পাল। এছাড়া সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের গবেষক ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একটি উপ-প্রকল্পের অধীনে দিনব্যাপী এ আয়োজনে সকাল থেকে শুরু হয় আলোচনা, তারপর কারিগরি অধিবেশন। টেকনিক্যাল সেশনে এসপিএম টিম তাদের গবেষণা ও মডেলিং কৌশল প্রদর্শন করেন। উপকূলীয় দুর্যোগ ও দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় আধুনিক গাণিতিক মডেলের ভূমিকা নিয়ে এ সেমিনার গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করেন আয়োজকরা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা সামাজিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক। প্রতিটি দুর্যোগের পর তারা বাস্তুচ্যুত হন, কিন্তু আমরা কোনো স্থায়ী সমাধান দেখি না। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্র হিসেবে আমি অনেক গুণগত তত্ত্ব পড়েছি, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সংখ্যার কোনো বিকল্প নেই। পরিমাণগত চিন্তাধারা বা ‘স্কুল অব কোয়ান্টিটেটিভ থটস’ আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রকল্পের গবেষণার ফলাফল আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সেমিনারের সভাপতি ও প্রকল্পের এএসপিএম অধ্যাপক ড. এম. আশাবুল হক জানান, ‘লিভিং উইথ ডিজাস্টার’ বা দুর্যোগের সাথে বসবাসের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এই গাণিতিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা মূলত দুটি দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রথমত, উপকূলীয় বনায়ন কীভাবে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে জলোচ্ছ্বাসের শক্তি ও উচ্চতা কমিয়ে দেয়, তা আমরা ‘স্নেল’স ল’ এবং ‘এনার্জি ব্যালেন্স ইকুয়েশন’-এর মতো গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করছি। ১৯৯১ এবং ২০০৭ সালের সিডরের সময় সুন্দরবনের যে সুরক্ষা ভূমিকা দেখা গেছে, সেটাকেই আমরা গাণিতিক মডেলে রূপান্তর করছি, যা ২০২৪ পরবর্তী জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর হবে।
সেমিনারের মুখ্য আলোচক প্রকল্পের সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার অধ্যাপক ড. গৌর চন্দ্র পাল জানান, ‘শ্যালো ওয়াটার ইকুয়েশন’ ভিত্তিক হাইড্রোডাইনামিক মডেলের সাহায্যে জোয়ার-ভাটার পানির উচ্চতা এবং জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব সিমুলেট করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের গবেষণার একটি অংশ হলো দুর্যোগ পরবর্তী মহামারি নিয়ন্ত্রণ। দুর্যোগের পর লোনা পানির অনুপ্রবেশের ফলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা নিরসনে ‘ডিজাস্টার ডাইনামিক মডেল’ অত্যন্ত কার্যকর হবে। এই পূর্বাভাস ব্যবস্থা নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। গবেষকরা জানান, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের আগস্টে শুরু হয়েছে এবং ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত চলবে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং সুবিধা স্থাপন এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রকল্প দলে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল মালেক, অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কুদ্দুসসহ একদল বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। সাইক্লোন ট্র্যাক প্রেডিকশন এবং ডিপ লার্নিং নিয়ে গবেষণার জন্য এতে বেশ কয়েকজন পিএইচডি ফেলো ও এমএসসি শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন। দিনব্যাপী এই সেমিনারে গবেষকরা তাদের গবেষণার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গাণিতিক বিজ্ঞানের অবদান তুলে ধরেন।