হাম ও হামের উপসর্গে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের চারজন হামে এবং ছয়জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হামজনিত মৃত্যুরোধে সরকার টিকা কার্যক্রম দিন দিন জোরদার করছে। গতকাল রবিবার চার সিটিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর একদিন আগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হামে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত চারজনই ঢাকার। উপসর্গ নিয়ে মৃত ছয় শিশুর পাঁচজন ঢাকায় এবং একজন খুলনায়। গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত হামে ২৮ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৬৮, নিশ্চিত হাম রোগী ১৫০ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৫৩ জন, ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জন, ছাড়পত্র পেয়েছে ৭ হাজার ৬৫৬ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী ২ হাজার ৬৩৯ জন।

গতকাল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশেনে একযোগে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশের বাকি অংশে এই টিকাদান কার্যক্রম চলবে। এর আগে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন অডিটরিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতিটি শিশুকে যদি আমরা সফলভাবে টিকার আওতায় আনতে পারি, তবেই আমরা এই আত্মঘাতী রোগ থেকে রক্ষা পাব। তিনি প্রতিটি অলিগলিতে এই কর্মসূচি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

তবে হাম-রুবেলা নিয়ন্ত্রিত হলেও সামনে ডেঙ্গুর বড় চ্যালেঞ্জ আসছে বলে সতর্ক করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সামনেই ডেঙ্গুর একটি ধাক্কা আসতে পারে। আমরা দুই-তিন দিন আগেই এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। মশার ওষুধ ছিটানোর ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক মিশ্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ওষুধের মান ঠিক থাকলে তবেই পূর্ণবয়স্ক মশা মারা সম্ভব হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হামের বিস্তার রোধে আইসোলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সব পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য বিশেষ আইসোলেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিকে একটি আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা স্বাস্থ্যকর্মীর পক্ষে সফল করা সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেটিভ আহমেদ জামশেদ মোহামেদ, ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ এমানুয়েল অ্যাব্রিউক্স। এতে সভাপতিত্ব করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, হঠাৎ করে এ বিষয়টি (হামের প্রাদুর্ভাব) এসেছে এমন নয়। বিগত সরকারের অসাবধানতার কারণে আজকে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

ঘরে ঘরে গিয়ে টিকার তথ্য দিতে রাজনীতিবিদদের আহ্বান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল বস্তিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন। সেখানে বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দিন-রাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জরুরি ক্যাম্পেইন সফল করতে হলে সবাইকে নিয়ে যে যার এলাকায় সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে এই ক্যাম্পেইন সফল করুন। এই ক্যাম্পেইন রাজনীতিবিদদের জন্য সুযোগ। আপনারা ঘরে ঘরে গিয়ে টিকাদান কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য দিন।’

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, গত পরশু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মানুষের জন্য কাজ করছি। বারবার মানুষের কাছে যাওয়ার মাধ্যমে আমাদের কাজের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। এই টিকাদান কার্যক্রম আমাদের জন্য জনগণের আরও কাছাকাছি যাওয়ার একটি বড় সুযোগ।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আপনার বাচ্চা টিকা নিল কি না, তাতেই হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। গোষ্ঠীর সবার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ তৈরি করা গেলেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। অন্তত ১০০ জনে ৯৫ জন শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। যাতে দু-চারজন বাদ গেলেও সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকে।’

অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানসহ অনেকে  বক্তব্য  দেন।