তার কণ্ঠে ছিল জাদুর ছোঁয়া। অসংখ্য কালজয়ী ও সুপারহিট গানের সম্ভার তাকে করে তুলেছে ‘মেলোডি কুইন’। দ্রোহ, প্রেম, রোমান্স থেকে বিরহ দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে হাজার হাজার গানে শ্রোতাদের মন কেড়েছেন। ২০টির বেশি ভাষায় ১৪ হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে নাম লেখানো সুরের আকাশের অন্যতম সেই নক্ষত্র আশা ভোঁসলে চলে গেলেন কালান্তরের পথে। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা নাগাদ ভারতের মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের এই সুরসম্রাজ্ঞী। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। আজ সোমবার বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে।
মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার এক্স হ্যান্ডেলে প্রয়াত গায়িকার সঙ্গে একাধিক ছবি পোস্ট করে শোক প্রকাশ করে লেখেন ‘ভারতের অন্যতম সেরা ও বহুমুখী কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলেজির মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত।’ তিনি আরও লিখেছেন ‘কয়েক দশকব্যাপী তার অসাধারণ সংগীতযাত্রা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। তার হৃদয়স্পর্শী সুর হোক বা প্রাণবন্ত কম্পোজিশন, তার কণ্ঠে ছিল এক চিরন্তন ঔজ্জ্বল্য। তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি চিরকাল মনে রাখব।’ এরপর প্রধানমন্ত্রী গায়িকার পরিবার ও অনুরাগীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন ‘তার পরিবার, অনুরাগী এবং সংগীতপ্রেমীদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবেন এবং তার গান মানুষের জীবনে চিরকাল অনুরণিত হবে।’
আশা ভোঁসলের পারিবারিক সূত্র ও ভারতের একাধিক গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই হৃদরোগে ভুগছিলেন তিনি। তবে গত শনিবার দুপুরের দিকে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকেই তিনি চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে ছিলেন। পরিস্থিতির বেশি অবনতি হওয়ায় তড়িঘড়ি তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টদের একটি বিশেষজ্ঞ দল তার চিকিৎসা করছিল। কিন্তু সব চেষ্টা বিফল করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান আশা ভোঁসলে। ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের চিকিৎসক ড. প্রতীত সামদানি তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
হিন্দি, মারাঠি, বাংলা, গুজরাটি, পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে ইংরেজি ও রুশ ভাষায় পারদর্শী আশা ভোঁসলে গজলেও ছিলেন অবিস্মরণীয়। বিশ্বসংগীতের আকাশের উজ্জ্বল এই ধ্রুবতারার জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সালে সাংলিতে। তার বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন খ্যাতনামী শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং থিয়েটার অভিনেতা। সংগীতের আবহে বেড়ে ওঠা আশা ভোঁসলেরা ছিলেন পাঁচ ভাইবোন। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন আশা। চার বছরের বড় দিদি লতা মঙ্গেশকর কাঁধে তুলে নেন সংসারের দায়িত্ব। আশাও দিদির পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। বাবার পরিচিত মাস্টার বিনায়ক, তিনিই ছোট্ট লতা আর আশাকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করান সিনে দুনিয়ার সঙ্গে। ১৯৪৩ সালে ১০ বছর বয়সে মারাঠি সিনেমা ‘মাজা বাল’ সিনেমায় ‘চলাচল নওবালা গান’ দিয়ে সংগীতজগতে পদার্পণ করেন আশা ভোঁসলে। এরপর ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘চুনারিয়া’তে তিনি প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে ‘রাত কি রানি’ ছবিতে আশা ভোঁসলে প্রথমবার একক গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন। ততদিনে লতা মঙ্গেশকর সংগীত জগতের পরিচিত মুখ। ১৬ বছরের আশা আর ২০ বছরের লতা দুই বোন মিলে মঙ্গেশকর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু আচমকা ছন্দপতন। দিদি লতা মঙ্গেশকরের ম্যানেজার ছিলেন গণপত রাও ভোঁসলে। ১৬ বছরের আশা মন দিলেন ৩১ বছরের গণপতরাওকে। দিদি জানতে পেরে বোনকে সাবধান করলেও কিশোরী মেয়ের উদ্দাম প্রেম বাধা মানেনি। বাড়ির অমতে পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করেন আশা। এরপর শুরু হলো আরেক সংগ্রাম ও সংসারে টিকে থাকার লড়াই। প্রেমের মাশুল দিতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে আশার। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যেই আশা ভোঁসলে প্রায় ৮০০ গান রেকর্ড করেন। কিন্তু এসব গান শিল্পী হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠা দেয়নি। কারণ ততদিনে লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্ত সুরের জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র। সংগীত পরিচালকদের পছন্দের তালিকায় ছিলেন শুধু লতা গীতারাই। তারা গাইতে রাজি না হলেই শুধু আশার কাছে গান গাওয়ার সুযোগ আসতে থাকে। ‘না’ শব্দটা ছিল না আশা ভোঁসলের অভিধানে। কঠিন পথ অতিক্রম করে ক্রমেই সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারকে অমান্য করে বিয়ে করেন গণপত রাও ভোঁসলেকে। এই বিয়ে সুখকর ছিল না। স্বামীর পরিবার থেকে অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসেন মায়ের বাড়িতে। এই অধ্যায় তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেললেও তাকে আরও শক্ত করে তোলে। পরবর্তী সময় সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত নয়, সংগীতেও এক নতুন যুগের সূচনা করে। তাদের যৌথ কাজ ভারতীয় সিনেমার সুরের ধারাকে বদলে দেয়। ১৯৫০-এর দশকে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকেন আশা ভোঁসলে। তবে সত্যিকারের ব্রেক থ্রু আসে ১৯৬০-এর দশকে। বিশেষ করে ‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমার গান তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আশার কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অভিযোজন ক্ষমতা। রোমান্টিক গান ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ক্যাবারে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, আধুনিক পপ ‘দম মারো দম’, গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’। তার গাওয়া গানের সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পীতে পরিণত করেছে।
অনেকেই যখন নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে আটকে থাকেন, তখন আশা ভোঁসলে বারবার নিজেকে আঙেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি নতুন প্রজন্মের সঙ্গেও কাজ করেন। এ আর রাহমানের সঙ্গে তার কাজ নতুন শ্রোতাদের কাছে তাকে পরিচিত করে তোলে। দীর্ঘ কর্মজীবনে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অজস্র চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের জন্য অসংখ্য গান রেকর্ড করে বহু পুরস্কার পেয়েছেন আশা ভোঁসলে। ২০০০ সালে তিনি সম্মানিত হন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে। ২০০৮ সালে পেয়েছেন পদ্মভূষণ। এ ছাড়া, ১৯৯৭ সালে গ্র্যামির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম, ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুম নে জো দিল কো’, ‘এক পরদেশি মেরা দিল লে গ্যায়া’, ‘ইন আঁখো কি মস্তি’, ‘তুমসে মিলকে’, ‘জওয়ানি জানে মন’।