মব নিয়ে উদ্বেগ, সর্বত্র আলোচনা

বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকেই দলবদ্ধ সহিংসতা বা মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে। এই ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না বলেও সরকারপ্রধান স্পষ্ট ঘোষণা দেন। গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আস্তানায় হামলা চালিয়ে ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মব সন্ত্রাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঘটনাটি নিয়ে বিশিষ্টজন যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তেমনি সরকারের ভেতরেও শুরু হয়েছে আলোচনা। মব সন্ত্রাস বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইন হাতে তুলে না নিতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ১ মাস ২৫ দিনে অন্তত ২১ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মারা গেছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় মব। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি দমনে অনেকটা ঢিলেঢালা ভাব দেখায়। এতে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে কুণ্ঠাবোধ করে না সাধারণ মানুষ। এরপর রাজনৈতিক হামলা, ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। এর থেকে রক্ষা পাননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠা মব বর্তমান সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকারে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কুষ্টিয়ার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। দেশে নির্বাচিত সরকার এবং ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকার পরও ঘটনার মোকাবিলা করতে না পারা বড় ব্যর্থতা।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’ সরকারের কঠোর অবস্থার মধ্যেও নিয়ন্ত্রণহীন মব সন্ত্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, উদীচী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। পৃথক বিবৃতিতে তারা কুষ্টিয়ার ‘পীর’ হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সারা দেশে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল থেকে ৩১ মার্চ ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩৩৭ জন হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে ৯৬, ২০২৫ সালে ১৯৮ এবং চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ) ৪৩ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।

ওই প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত মবে ঢাকায় ৮১, চট্টগ্রামে ৩৬, খুলনায় ১৯, রাজশাহীতে ১৭, বরিশালে ১৬, রংপুরে ১২, ময়মনসিংহে ১৩ এবং সিলেটে ৪ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর পর্যন্ত মবে ঢাকায় ৪১, চট্টগ্রাম ১৪, খুলনা ও রাজশাহীতে ১২, বরিশাল ৬, রংপুর ৫ এবং সিলেট ও ময়মনসিংহে ৩ জন করে হত্যার শিকার হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএফএস) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ৩৯ এবং আহত ৫৯ জন। এ ছাড়া জানুয়ারিতে ৪৭ (নিহত ২১ ও আহত ২৬) এবং ফেব্রুয়ারিতে ৫১ জন (নিহত ১৮ ও আহত ৩৩)। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার মৌখিকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। মব এখনই মোকাবিলা না করা গেলে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের ট্যাগ দিয়ে হত্যা-নির্যাতনসহ ভাঙচুরের ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এ কারণে সাধারণ মানুষ কথা বলেননি। এটাই মব সন্ত্রাসীদের বড় শক্তিতে রূপান্তর হয়েছে। এখনো যদি ট্যাগ লাইন দিয়ে মব সৃষ্টি করা হয়, আর সরকার চুপ থাকে। তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএফএস) প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান বলেন, কুষ্টিয়ার ঘটনায় পুলিশ ও সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এমন ঘটনা আর না ঘটুক সেই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।’

সরকারের অবস্থান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ও মাহমুদুল হক রুবেল শপথ শেষে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন কেউ যেন কখনো আইন হাতে তুলে না নেন। কোনো সমস্যা হলে প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে বা সরাসরি তাকে জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা বাহিনীকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলাকায় যাতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে সেভাবে আপনারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবেন। কেউ যেন এমন কিছু না করে যার জন্য এলাকার শান্তি নষ্ট হয়, সেক্ষেত্রে আপনাদের দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো। আইন কখনো নিজের হাতে তুলে নেবেন না। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যেকোনো মূল্যে এলাকার উন্নয়ন করতে হবে, যেকোনো মূল্যে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।