চুক্তি ছাড়াই শেষ ২১ ঘণ্টার বৈঠক

দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা টানা আলোচনা হলেও যুদ্ধ বন্ধের জন্য কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যে এবারকার যুদ্ধ স্থায়ীভাবে থামাতে গত শনিবার বিকেল থেকে ইসলামাবাদে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশ যার যার দিক থেকে ‘চূড়ান্ত সীমার’ (রেড লাইন) বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় অন্য কিছু বিষয়ে তাদের একমত হওয়া এবারকার মতো কোনো কাজে আসেনি।

তবে কী কী বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তা উভয় পক্ষের কেউই এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও প্রকাশ করেনি।

গতকালের আলোচনায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় দুটি বাধার একটি ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধরে রাখার বিষয়ে যুুক্তরাষ্ট্রের রাজি না হওয়া। আর দ্বিতীয় বাধা হিসেবে দেখা গেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে ইরানের রাজি না হওয়া।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এবারকার যুদ্ধের অবসান হতে পারে, এমন প্রত্যাশা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠায়। সারা বিশে^র নজরও ছিল আলোচনাস্থল ইসলামাবাদের দিকে।

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতা ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করার আগে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কেড়ে নেওয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাক্সক্ষী শর্ত এ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ এমন দাবি করে ইরান প্রতিনিধিদলের এক সদস্য বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজকে বলেন, যুদ্ধে তারা যা যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার মাধ্যমে সেসব তারা দখল করতে চেয়েছিল।

ইরান প্রতিনিধিদলের নেতা ও দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অবশ্য পরবর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য দেশটির পক্ষ থেকে ‘দরজা খোলা’ রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরান সবসময় সামরিক ব্যবস্থার সমান্তরালে শক্তিশালী কূটনীতির ওপর জোর দেয়, এমনটি উল্লেখ করে গতকাল এক এক্স-পোস্টে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না।’ তিনি আরও বলেন, ইরান গত ৪০ দিনের যুদ্ধে দেশটির অর্জনগুলো সুরক্ষিত করতে কাজ চালিয়ে যাওয়া এক মুহূর্তের জন্য থামাবে না।

এখনো সুযোগ দেখছেন বিশ্লেকরা : পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে দেশটির সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি গতকাল বলেন, আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এত বেশি যে, কয়েক ঘণ্টার একটি আলোচনার মাধ্যমে এ সমাধান প্রত্যাশা করা অবাস্তব ব্যাপার।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ রিচার্ড এন. হাস বলেন, ‘আলোচনায় সবসময়ই বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয়। এ কারণে, ইরানের ওপর শান্তির শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া অনিবার্য ছিল।’ প্রথম দফার আলোচনায় সবসময়ই একটি ভূমিকা পর্ব থাকে এবং এ পর্যায়ে কোনো যুগান্তকারী সাফল্যের সম্ভাবনা কম থাকে, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক খেলা সবে শুরু হয়েছে।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, আলোচনা সম্ভবত শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ‘আরও আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তা পাকিস্তানে হবে নাকি অন্য কোথায়, তা স্পষ্ট নয়।’

ভাইস প্রেসিডেন্ট নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটির এত দূর থেকে পাকিস্তানে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারকে প্রমাণ করে, এমন দাবি করে কুগেলম্যান বলেন, ভ্যান্সের ‘মন্তব্য’ সত্ত্বেও আলোচনা ও চুক্তি সইয়ের সুযোগ সম্ভবত শেষ হয়ে যায়নি। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তি চায়, যা তাকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম করবে।   

ইইউ ও রাশিয়ার মধ্যস্থতার প্রস্তাব : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। পুতিন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়া সহায়তা দিতে প্রস্তুত।  

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টায় অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ব্রাসেলসভিত্তিক সংস্থাটির  পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র আনুয়ার এল আনুনি গতকাল বলেন, অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় রেখে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর আরও প্রচেষ্টা নেওয়া হলে ইইউ তাতে অবদান রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালালে এ যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানের উদ্যোগে আলোচনায় বসার সুযোগ তৈরির জন্য গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিনের এক যুদ্ধবিরতি চলছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধে স্থায়ী চুক্তি না হলেও চলমান যুদ্ধবিরতিটিই চূড়ান্ত মীমাংসা হিসেবে বহাল রাখা হতে পারে।

সামুদ্রিক অবরোধের হুমকি ট্রাম্পের : শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি না হওয়ায় চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই আবারও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংঘাতে জড়ানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ আরোপের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। রবিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ট্রাম্প অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হয়েছে এমন দাবি করে একই সঙ্গে ইরানের পেতে রাখা মাইন সরিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথাও বলেছেন। তার এ ঘোষণার পর ইরানের কর্মকর্তারা কড়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ প্রণালি দিয়ে সামরিক জাহাজ চললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

বিশ্লেষকদের মতে, ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ হলো সমুদ্রপথে কোনো দেশের পণ্য পরিবহন বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে চীন ও ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে ইরানের তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ভেনেজুয়েলার ওপর একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছিল। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে অবরোধ কার্যকর হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বাড়তে পারে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গতকাল করা একটি মন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বিশ্লেষকরা বলেন, যেকোনো সময় দেশগুলো আবার সংঘাতে জড়াতে পারে। যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘প্রচারাভিযান এখনো শেষ হয়নি’।