কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দরবারে হামলা চালিয়ে ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের রাত থেকে সাতটি আইডি থেকে একটি পুরনো ভিডিও ছড়ানো হয় বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। এই আইডিগুলো শনাক্তও হয়েছে বলে জানা গেছে।
গতকাল রবিবার পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাব, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি এবং জড়িত কাউকে আটকও করা হয়নি।
লাশের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বাদ আছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা প্রহরায় গ্রামের কবরস্থানে লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু বলেন, ‘কে ‘পীর’, কে বাউল, কে ফকির, কোথায় কীভাবে ধর্ম অবমাননা করল, সেটা দেখার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসন আছে। আইন আছে, বিচার আছে। কারো কোনো আপত্তি থাকলে বা সংক্ষুব্ধ হলে তার জন্য বিচার বিভাগ আছে। তাই বলে এভাবে তা-ব চালিয়ে মানুষ হত্যার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’
উল্লেখ্য, প্রয়াতের ভাই গতকালই জানিয়েছিলেন, তারা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলার ব্যাপারে আগ্রহী নন।
রাত থেকে সাতটি আইডি দিয়ে ছড়ানো হয় ভিডিও : দরবারে হামলার ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। সন্দেহভাজন একজনের তৎপরতা নজরধারীর মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ফিলিপনগর এলাকায় ফেসবুকের সাতটি আইডি (তিনটি পেজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি) থেকে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট হতে থাকে। এই ফেসবুক আইডিগুলো বাংলায় লেখা। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’। শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মেসেঞ্জার ও আইডিতে শেয়ার হতে থাকে।
যে সাতটি আইডি থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর দুয়েকটির অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাটি পরিকল্পিত : স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একদল লোক এ হামলা চালায়। প্রশাসনের ভাষ্য, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তারা হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দরবার হলসহ বিভিন্ন স্থানে। খবর পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে হামলার শুরু থেকেই ঘটনাস্থলে দৌলতপুর থানা পুলিশের লোকজন উপস্থিত ছিল।
নিহত ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের পরিবার ও ভক্ত অনুসারী সূত্রে জানায়, শামীম ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ গড়ে তোলেন। তিনি নিজেকে ‘সংস্কারপন্থি ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তিনি এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কিছুদিন ঢাকায় চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক ধর্ম চর্চায় নিজেকে যুক্ত করেন। ২০২১ সালের মে মাসের দিকে তার দরবারে এক শিশুর লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এই ‘পীর’ আলোচনায় উঠে আসেন। ওই বছরই তার আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের এক নেতা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। বেশ কিছুদিন করাবাসের পর ওই ‘পীর’ জামিনে মুক্তি পান। ঠিই ওই একই ভিডিও হঠাৎ করে গত দুই দিন আগে কে বা কারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এলাকার সাধারণ লোকজনকে উত্তেজিত করে তোলে। শনিবার দুপুরের এই হামলা একেবারে ঠা-া মাথায় পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে করেছে তারা।
খুনের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে আসক ও এইচআরএসএস কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আব্দুর রহমান শামীমকে ‘‘পীর’’ আখ্যা দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা, তাকে পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা, দরবারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দুই মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে এ দুই সংস্থা।
গতকাল রবিবার আসকের বিবৃতিতে বলা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এ ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয় কোনো অভিযোগ বা মতবিরোধের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সংঘবদ্ধ জনতার নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কার্যত সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয় এ ধরনের নৃশংস হামলা ও হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অজ্ঞাত ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে সুফি সাধক, মাজার ও ধর্মীয় আস্তানাগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। সেসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পিটিয়ে হত্যার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় এসব সহিংসতা প্রতিরোধ ও বন্ধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আজকের বাস্তবতায় পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।