জনমতের জয়: নিকুঞ্জে খেলার মাঠ দখল করে অবৈধ মেলা বন্ধ করল প্রশাসন

রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠটি দখল করে বৈশাখী মেলা আয়োজনের যে হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, প্রবল জনমত ও প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে তা শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়ে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে এই অনিয়ম ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করার বিষয়টি নিয়ে অব্যাহত সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সমিতি অবশেষে তাদের ইস্যু করা সেই বিতর্কিত ও ‘কথিত’ অনুমতিপত্রটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। 

তবে সমিতির এই পিছুটান ছিল মূলত লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; কারণ তাদের এই বাতিলের সিদ্ধান্তের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগেই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা প্রাঙ্গণে অভিযান চালিয়ে সকল কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত রবিবার বিকেলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, রাতের মধ্যেই মাঠের সকল অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে মাঠটি শিশুদের খেলার উপযোগী অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। 

একটি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত আবাসিক কল্যাণ সমিতি কীভাবে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন কিংবা ডিএমপির কোনো প্রকার পূর্বানুমতি ছাড়া একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দিতে পারে, তা নিয়ে এখন সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

​ঘটনার নেপথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। জানা গেছে, নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সমিতিতে বর্তমানে সাধারণ বাসিন্দাদের দ্বারা নির্বাচিত কোনো নিয়মিত কমিটি নেই। সমিতিটি বর্তমানে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক ইনসান আলীর নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। 

একজন সরকারি প্রতিনিধি হয়েও তিনি কীভাবে এলাকার হাজার হাজার মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে খেলার মাঠে মেলার অনুমতি দিলেন, তা নিয়ে খোদ সমিতির সদস্যদের মধ্যেই চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রশাসক ইনসান আলী স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে দেখা গেছে, কুদ্দুস নামক জনৈক এক ব্যক্তিকে মেলা আয়োজনের এই অবৈধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওই কুদ্দুস নিকুঞ্জ বা খিলক্ষেত এলাকার কোনো বাসিন্দাই নন; তার স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুরের এরশাদনগরে। 

একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এবং কিসের বিনিময়ে রাজধানীর একটি অভিজাত আবাসিক এলাকার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাঠটি ইজারা দেওয়া হলো, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট প্রশাসক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর পেছনে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন এবং একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সরাসরি চাপ কাজ করেছে।

Untitled-1 copy

​সরেজমিনে তদন্তে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে এই মেলা আয়োজনের নেপথ্যে থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নাম স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বৈশাখী মেলার আবরণে এই মাঠ দখলের পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করছিলেন খিলক্ষেত থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ জহির উদ্দিন বাবু ওরফে জহির বাবু, থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুরাদ মজুমদার এবং মোঃ আলম মোড়ল ওরফে হোটেল মেসিআর মোড়ল। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকেল পর্যন্ত এই চক্রের কয়েক ডজন অনুসারী মাঠে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের গতিতে মেলার স্টল নির্মাণের কাজ তদারকি করেছেন। তারা কয়েক শিফটে বিভক্ত হয়ে মাঠ পাহারা দিচ্ছিলেন যেন সাধারণ মানুষ বা স্থানীয় কিশোর-তরুণরা মাঠে প্রবেশ করে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। মূলত দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একটি অরাজনৈতিক কল্যাণ সমিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার এই অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরতায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

​সোমবার বিকেলে সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। মাঠের উত্তর পাশে পড়ে থাকা কিছু ভাঙাচোরা ফুডকোর্টের অংশ ছাড়া বাকি পুরো মাঠ এখন দখলমুক্ত। কয়েকদিন ধরে চলা উত্তেজনা ও দখলদারদের গগনবিদারী শব্দের বদলে এখন শোনা যাচ্ছে কিশোরদের উল্লাস। সম্পূর্ণ খালি মাঠে এলাকার একদল তরুণকে পরম আনন্দে ফুটবল খেলতে দেখা গেছে। মাঠে খেলতে আসা ইশতিয়াক নামক এক তরুণ তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন এই অবৈধ মেলা বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা আমাদের মাঠ ফিরে পেয়েছি। এটি শুধু আমাদের মাঠ নয়, আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। আমরা চাই ভবিষ্যতে যেন কোনো অজুহাতেই আমাদের খেলার মাঠে এরকম দখলদারিত্বের শিকার হতে না হয়। 

এ বিষয়ে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, জনস্বার্থ ক্ষুন্ন করে এবং খেলার মাঠের পরিবেশ নষ্ট করে কোনো ধরনের মেলা বা বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। নিকুঞ্জ-২ খেলার মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজনে কোনো যথাযথ প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল না। তাই বিষয়টি নজরে আসতেই জনস্বার্থে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 সচেতন সমাজ মনে করছে, এই জয়ের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হলো যে, জনমত ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো সিন্ডিকেটই টিকে থাকতে পারে না। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যারা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই অবৈধ বরাদ্দের সাথে জড়িত ছিলেন, সেই প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।