চলতি বছর অতিবৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় হাওরে একমাত্র ফসল ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলেও তা কাটিয়ে নেত্রকোনার হাওরগুলোতে শুরু হয়েছে ধান কাটা উৎসব। জেলার হাওর বিস্তৃত ছয়টি উপজেলায় নতুন ফসল ঘরে তুলতে মাঠে নেমেছেন কৃষকরা। বিশেষ করে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরির কৃষকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, নতুন মৌসুমের শুরুতে জেলার প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ফসল ইতোমধ্যে ঘরে তুলেছেন কৃষকরা। এর মধ্যে মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরের জমিগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি ফসল সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া হাওর বিস্তৃত প্রতিটি উপজেলায় আগাম ফসল ঘরে তোলার আশায় পর্যায়ক্রমে কাজ করছেন চাষিরা।
প্রায় চার মাস সময়মতো সার, বীজ, সেচ ও পরিচর্যা শেষে বেড়ে ওঠা স্বপ্নের ফসল এখন ঘরে তুলতে মাঠেই কাটছে কৃষকদের বেশিরভাগ সময়। আর এই ধান কাটতে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও হাওরে এসেছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। হাওরে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও দল বেঁধে ধান কাটছেন কৃষকরা।
দ্রুত সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তুলতে প্রতি বছরের মতো এবারও হাওরের প্রতিটি প্রান্তে কাজ করছে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন। জমি থেকে ধান সংগ্রহ করে সরাসরি বস্তায় ভরে মহাজনদের কাছে বিক্রি করছেন কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাওরে প্রায় সাড়ে ৪০০ কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ধান কাটার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এই মেশিন ব্যবহারের ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বছর মেশিনের পাশাপাশি জ্বালানি তেল নিয়ে কিছুটা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত হাওরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না পেয়ে মাঝেমধ্যে মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া থেকে শুরু করে মাঠের ফসল ঘরে তোলা—সব ক্ষেত্রেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভালো ফলন নিয়ে ঘরে ফিরতে পারলে এই সংকট কেটে যাবে বলে তারা আশাবাদী।
ভালো ফসলের পাশাপাশি ধানের ন্যায্য দাম পাওয়াও কৃষকদের কাছে বড় বিষয়। হাওরে উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম না মিললে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক কৃষকরা। হাওরের জমিগুলোতে এক সময় স্বল্পকালীন জাত হিসেবে ব্রি-ধান ২৮, ৮৮ ও ২৯ এর ব্যবহার বেশি থাকলেও এবার তা অনেক কমেছে। গত কয়েক বছর রোগবালাইয়ের প্রকোপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হওয়ায় স্বল্পকালীন এসব জাতের পরিবর্তে এবার হাইব্রিড জাতের আবাদ হয়েছে বেশি। এর ফলে হাওরের এক কাঠা (১০ শতাংশ) জমি থেকে এ বছর ৬ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা।
বর্তমানে হাওরে হাইব্রিড মোটা ধান কাটা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনে কাটা এসব ধান মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮২০ টাকার মধ্যে। কৃষকরা জানান, শুরুর দিকে ধানের দাম কিছুটা বেশি থাকলেও এখন তা কমতে শুরু করেছে।
চলতি মৌসুমে জেলার হাওর বিস্তৃত ৬ উপজেলার প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এখান থেকে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া পুরো জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হতে পারে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা।
খালিয়াজুরির কৃষক আব্দুল হাসিম বলেন, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। গত তিন বছর আমরা বাম্পার ফলন পেয়েছিলাম। কিন্তু এবার চৈত্র মাসের আগেই অতিবৃষ্টিতে অনেক জমি তলিয়ে গেছে এবং জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হয়েছে। এখন নতুন করে আগাম বন্যা না হলে যে জমিগুলোতে ধান পেকেছে তা ঘরে উঠবে। বর্তমানে মোটা ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম আরেকটু ভালো পেলে কৃষকরা আরো লাভবান হতো।
কৃষক জামিল উদ্দিন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার হাওরে মেশিন কিছুটা কম নেমেছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। মাঝেমধ্যে তেলের অভাবে হাওরের মাঝখানে মেশিনগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকে। বিশেষ বিবেচনায় যদি হারভেস্টার মেশিনগুলোকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়, তবে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হবে। নাহলে আগাম বন্যার যে শঙ্কা রয়েছে, তাতে ফসলের বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, হাওরে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ফসল ঘরে তোলা হয়েছে। যা মোট লক্ষ্যের প্রায় ১১ শতাংশ। কৃষকরা যেন দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারেন সেজন্য সাড়ে ৪শ কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে। জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল সরবরাহের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি।
তিনি আরও জানান, আগাম বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কিছু ক্ষতি হলেও বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। কৃষকরা এই সময়ের মধ্যেই তাদের কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আর জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, কৃষকরা যেন কোনও শঙ্কা ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনগুলোর জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগাম বন্যার আগেই কৃষকরা নির্বিঘ্নে তাদের কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।