সোনারগাঁওয়ে শতবর্ষী বটবৃক্ষকে ঘিরে 'বউ মেলা' 

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার জয়রামপুর গ্রামে কয়েক শ বছরের পুরনো এক বটগাছকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহ্যবাহী বউ মেলা শুরু হয়েছে।

আজ বুধবার সকালে পূজা অর্চণার মধ্য দিয়ে এ বউ মেলা শুরু হয়। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীর লোকজন শত শত বছর যাবত বংশ পরম্পরায় এ মেলার আয়োজন করে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীর বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী বৈশাখের প্রথমদিন এ পূজা করে থাকেন।

মেলায় অংশগ্রহণকারী সনাতন ধর্মাবলম্বীর লোকজন জানান, এ মেলায় সাধারণত নববধূ থেকে শুরু করে নানা বয়সী নারীরা অংশগ্রহণ করে থাকেন তাই এ মেলার নাম হয়েছে বউ মেলা। কয়েক শ বছরের প্রাচীন বটগাছের নিচে এ মেলা বসে। তিন দিনব্যাপী এ মেলার প্রথম দিন নারীরা বটবৃক্ষকে পূজা দিয়ে বিভিন্ন মানত করে থাকেন।

বট গাছটিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবী বলে আখ্যায়িত করেন। তাই অনেকে এ মেলাকে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মেলাও বলে থাকেন। সংসারের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নারীরা দল বেঁধে এ মেলায় এসে প্রাচীন বট বৃক্ষকে পূজা দিয়ে থাকেন। ঝুড়ি ভর্তি বৈশাখী ফলের ভোগের সঙ্গে কবুতর উড়ানো ও পাঠা বলি দেওয়া হয় বটবৃক্ষের নিচে। বউ মেলায় আগত অধিকাংশই হচ্ছে নারী হলেও পুরুষরাও এ মেলায় অংশ নেন।

পূজার তত্ত্বাবধানে থাকা নীলোৎপল রায় জানান, বউ মেলায় তরমুজ, কাঁঠাল, কলা, আম, বাঙ্গি, শঁশা ও মৌসমী বিভিন্ন ফল নিয়ে লাইন ধরে বটবৃক্ষ তলে নারীরা ভোগ দিয়ে থাকেন। এখানে আগত নারীরা উপবাস থেকে সকালে বেতের ও বাশেঁর তৈরি টুকরিতে করে মাটি ভরে মাথায় করে বটবৃক্ষের পাদতলে দিয়ে থাকেন। পরে শত শত নারী পূজায় বসে আরাধনা করেন। পূজায় অংশ নেওয়াদের ধারণা এখানে আরাধনা করলে ‘স্বামী সংসারের বাঁধন অটুট থাকবে এবং স্বামী সন্তানদের নিয়ে সুখ শান্তিতে সংসারে বসবাস করতে পারবে’। ভোগে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ফল পূজা অর্চনা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করে দেওয়া হয়।

বউ মেলায় পূজা দিতে আসা ষাটোর্ধ অঞ্জলি রানী জানান, আমি ছোট বেলা থেকে এখানে পূজা দিয়ে আসছি। আমরা সিদ্ধেশ্বরী কালী দেবী হিসেবে এ বৃক্ষকে পূজা দেই। প্রথা অনুযায়ী এ বৃক্ষের গোড়ায় বিভিন্ন বয়সী নারী মাটি দিয়ে থাকেন। মাটির সাথে একটি করে কড়ি দিতে হয়। এতে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। তাছাড়া পরিবারের সদস্য যতজন ততবার মাটি দিতে হয়।

তিনি আরও জানান, বৃক্ষের গায়ে সরিষার তেল ও দুধ ঢালা হয়। তাছাড়া কলাপাতায় সিঁদুরের ফোটা দিয়ে জবাফুল, ফুল কাঠ মালতি ফুল, মৌসুমী ফল ও পান পাতা সাজিয়ে বৃক্ষ তলে অর্পণ করা হয়ে। সঙ্গে দেওয়া হয় মোমবাতি, আগরবাতি ও আমপাতা। পরে ব্রাহ্মণের উপস্থিতিতে সম্মিলিতভাবে ভোগ নিয়ে দুপুরে পূজায় অংশ নেন এখানে আগত নারীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকের তালে বৃক্ষ তলে পূজায় মগ্ন আছেন নারীরা। এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে বাঁশের বাঁশি,কাঠের হাতি, ঘোড়া ও মৃৎশিল্প সামগ্রী, চেয়ার, পিঁড়ি, জলচৌকি ও ঐতিহ্যবাহী খই, উড়খা, কদমা, পিঁয়াজু, নিমকি, জিলাপীসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসেছে। বউ মেলা নারীদের মেলা হলেও এখানে পুরুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।