মনে রাখতে হবে আমাদের

সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, আনন্দ শোভাযাত্রা বা মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রাগুলোর মধ্যে আপনার কোনটি ভালো লাগছে? কেন ভালো লাগছে? এর কারণ নিজেই বিচার করুন নিজস্ব মনে কিংবা লিখে ফেলুন, ভালো লাগার নেপথ্য কারণ এবং তার যুক্তিগুলো। কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্যতা পায় না, যুক্তি ছাড়া। পাওয়া উচিত নয়। আধুনিক পশ্চিমা যুক্তিবাদ এটিই আমাদের শিখিয়েছে। আমরা তা মাথা পেতে নিয়েছি। বিনা যুক্তিতে আধুনিকতাবাদ কোনো কিছুকে গ্রহণের পক্ষে নয়, সে ক্রিটিক্যালি সব কিছুকে বিচার করে। বাস্তবকে বস্তুতান্ত্রিকতা দিয়েই বিচার করা হয়। অবস্তুগত কোনো উপাদানের মূল্য তাতে নেই। কিন্তু এটাও ঠিক, সংস্কৃতির সব উপাদান, উপকরণ আধুনিকতাবাদী চিন্তাধারার সব যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন ধর্ম-সংস্কৃতি। ধর্ম চিন্তার, এর প্রবাহের সব উপাদানকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তার সব উপাদান যুক্তি নয়, বিশ্বাস নির্ভর। সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যাও করা যায় না। কেন সব কিছু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, আবার এরও যুক্তিসংগত কোনো যুক্তি নেই। এসব গোলকধাঁধার মতো জটিল। আমাদের বাংলা নববর্ষের পহেলা দিনটি বৈশাখের। এ দিনটি উদযাপনের সময় আমরা নানা নামে তাকে ডাকি, ডেকে আসছি, নামকরণ করেছি। কখনো তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, আবার কখনো অগ্রহণযোগ্য। এই মতভিন্নতা, এই দ্বিমতের ঐশ^র্য সংস্কৃতিরই রূপ। এটি ভাবনার নতুন মাত্রা। কিন্তু তা গণমনের চিন্তার প্রকাশ। একে আমরা বাদ দিতে পারি না, লালন করি অন্তরের ভেতরে। এটাই সভ্যতার প্রবাহ এবং সম্মিলিত প্রবাহের রূপ। চিন্তার এই যে ভিন্ন ভিন্ন তন্তু বা সুতো, সেমাইয়ের মতো দেখতে, তারও চেয়ে পাতলা ও সূক্ষ্ম তা চিন্তা নদীর মতোই কাল থেকে কালান্তরে প্রবহমান। এই প্রবহমানতাই সংস্কৃতির আসল তরিকা।

এর ফলে যখন আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, পহেলা  বৈশাখ তো আমাদের ফসলি সন। ফসল কাটার সময়। বৈশাখে ধান কাটার ধুম লাগে। তখন কৃষকের খুতিতে জমে অর্থ-বিত্ত। ডোলে, কোলায়, জালায় জালায় ধানের ভর-ভরতি সমারোহ। উঠোনে উঠোনে ধানের আঁটির পালা। ক্ষেত থেকে ফসলের আঁটিগুলো এসে জড়ো হয় উঠোনের এক নির্দিষ্ট কোণে। এরপর আঁটি থেকে ধান আলাদা করার প্রক্রিয়ার নামই গরু দিয়ে মলন দেওয়ার সামাজিক ব্যবস্থা। এই যে সৃষ্টিশীলতার রূপ, তা একান্তই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে এই উৎপাদন প্রক্রিয়া। এটা বহুদূর থেকে লক্ষ্য করেছিলেন একজন, যিনি সাম্রাজ্যের মালিক, সম্রাট আকবর কিংবা তিনি নন, হয়তো তার নবরত্ন সভাসদদের কেউ একজন বলেছিলেন বা ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে কর তোলা যায় কীভাবে? কখন কৃষক সম্রাটের জন্য টাকা দিতে পারবে? সেই টাকা যে রাজকোষ পূর্ণ হবে, তাতে কোনো ভুল নেই। চিন্তাটা অর্থলাভের সঙ্গে জড়িত। ব্যবস্থাটা প্রাপ্তির সঙ্গে ওতপ্রোত। এটাই হচ্ছে সংস্কৃতি চর্চা। এটাই আমাদের ভাবনার কেন্দ্রে থাকার কথা। কিন্তু ভাবনাগুলো ছিনতাই হয়েছে। সেই ভাবনাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে করা হয়েছে আনন্দ, মঙ্গল, সুন্দরের অংশ। পরম্পরার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মনে হতে পারে এটা কোনো ট্যাক্স পেয়িং সময় নির্ধারণের নয়, কর তোলার উৎসব নয়, এটা আমাদের জীবন ও কর্মের মর্ম। আসলে এই কর্ম কোনো মর্মের বিষয় নয়। নিছক গণনার পেছনে আছে এমন উদযাপন, যা মূলত লাভের হিসাব। ফসল তোলার সঙ্গে গণনা-রীতি। এই গণনার উৎস টাকা পাওয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও, তা আমরা ভুলে গেছি- ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কী কী সব উপকরণের সাহায্যে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার নমুনা আমরা দেখছি।

শুধু একপক্ষের নয়, বিষয়টি দ্বিধারী ছুরির মতো। সম্রাটকে কৃষক তার কর পরিশোধ করায়, সম্রাটের গোলা পূর্ণ হচ্ছে। আর দেশের কৃষকরা যে খরার সময়, অর্থনৈতিক মন্দার সময় ধনীর কাছে থেকে ধান ঋণ হিসেবে এনেছিল, খেয়ে-পরে বেঁচেছিল, তাও সে পরিশোধ করে বৈশাখী ফসল তোলার পর। আর দোকানে দোকানে যে হালখাতা খোলা হয়, তার পেছনে আছে প্রাপ্তি যোগ। পুরনো হিসেবের যত বকেয়া আছে, গ্রাহক তা ধান বিক্রি করে পরিশোধ করে দিতে পারে এই খুশিতে দোকানদার তাকে মিষ্টি খাওয়ায়। এই রীতি চলতে চলতে, আজ আমাদের অর্থনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আসলে কি তা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ? নাকি বিক্রি-বাট্টার একটি প্রক্রিয়ার অংশ বা দেনা-পাওনার খেলা? এটাও আমাদের সামাজিক জীবনের অংশ। আমাদের কর্মজীবিকার অংশ এবং আমাদের সাংস্কৃতিক যাত্রার অংশে পরিণত হয়েছে। আমরা দেনা-পাওনার আদান-প্রদানের সূচনা দিনকে উৎসবে পরিণত করেছি। এই চর্চাও আমাদের শেখায় যে, মতভিন্নতা ও মতাদর্শ ভিন্নতাও একই পাতে থাকতে পারে। থাকাটা অন্যায় নয়। ন্যায় আর অন্যায় মিলেই তো সামাজিক প্রবাহ, সাংস্কৃতিক যাত্রা।

২. এবার আসা যাক কৃষকের কথায়। কৃষক চিরকাল নিজের খেয়ে, পরেরটা মজবুত করেছে। নিজের জমি, নিজের শ্রম বিনিয়োগ করে যে ফসল সে উৎপাদন করেছে, তার জন্য তাকেই আবার সম্রাটকে কর দিতে হয়েছে। মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। দোকানের বাকি-বকেয়াও সে পরিশোধ করেছে। মানে সব দায় তার। এটাই ছিল চিরন্তন ব্যবস্থা। এই চিরকালীন ব্যবস্থার রূপ পাল্টেছে। এখন সে সরকারকে জমির জন্য ট্যাক্স দেয়। সরকার বাণিজ্য করে সার দিয়ে। বলে সে ভর্তুকি দিচ্ছে সার উৎপাদনে, বিতরণে ইত্যাদি। সেই সার কৃষক কিনে নিয়ে যায়। ক্ষেতের উর্বরা শক্তি বাড়ায়। ভালো ফলন হয়। তার লাভ না থাকুক, সে গোলা ভরে রাখতে পারে। ধান বিক্রি করে সংসারের যাবতীয় অভাব দূর করে দেয়। এখন প্রতিটি কৃষক যাতে টাকা পায়, রাজকোষাগারের টাকা, যা আসলে কৃষকেরই টাকা। গচ্ছিত ছিল বা আছে সরকারের কোষে, সেখান থেকেই প্রণোদনা দেয় সরকার। অতীতে এমনটা ছিল না। এবারই সরকার প্রধান ২ কোটি ৭৫ লাখ উৎপাদক কৃষককে কৃষককার্ড দিয়ে চলেছেন। এর সূচনা হয়েছে, ওই পরম্পরার প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ, টাঙ্গাইলের কৃষকদের মাঝে। দাতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারেক রহমান ১৫ জন কৃষককে হাতে কৃষক কার্ড তুলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে একটি করে ফলদ গাছও উপহার দিয়েছেন। বলেছেন, আপনারা ফল গাছ বুনেন। আমি সেই গাছের ফল খাবো।

খুবই সিগনিফিকেট কথাটি। শাদা চোখে মনে হবে, প্রধানমন্ত্রী ফল খাওয়ার আবদার বা ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেটাই প্রাথমিক সত্য। তবে এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্য হচ্ছে আপনারা যত ভালো থাকবেন ততই সরকারের লাভ। সরকার ফসল উৎপাদন করে না। কিন্তু সরকার ভোক্তা ফসলের। তাই সে কৃষককে আরও ভালো সেবা দিতে ইচ্ছুক। এতকাল তো কোনো সরকারপ্রধান এ রকমটি করেননি। ব্যতিক্রম হিসেবে বেগম খালো জিয়া ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াই কৃষকের কথা মনে-প্রাণে ভেবেছিলেন। তখন সম্পদ কম ছিল, ব্যবস্থাপনাও ছিল ছোট আকারের। জনগণও ছিল কম, কৃষকও ছিল কম। শহীদ জিয়ার সময় কৃষক ছিল ৮-সাড়ে ৮ কোটি, খালেদা জিয়ার সময় ছিল ১২-১৩ কোটি। কিন্তু ব্যবস্থাপকও ছিল কম। তারপরও সেই সময় যে মানবিক প্রণোদনা কৃষক পেয়েছিল তার তুলনা হয় না। এই যে সামান্য ঋতুচক্রভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল তাকে যন্ত্রনির্ভর করে তোলার সূচনা হয় সেই সময়। এরশাদের সময়ও এই ধারা অব্যাহত ছিল। হাসিনার সময়ও তা বেড়েছে বটে, তবে যা করার ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি খরচ করে এক লুটের তরিকা গড়েছিলেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে, এবার প্রকৃত পরিকল্পনার ছকের মধ্যে তারেক রহমান কৃষকের জন্য এক নবযাত্রার সূচনা করলেন। এই সূচনা ঐতিহাসিক। এর আগে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়নি। এর আগে সরকারের কোষাগার থেকে বছরে প্রণোদনার অর্থ কোনো কৃষকের ঘরে যায়নি। পর্য়ায়ক্রমে ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক বছরে ২ হাজার ৫শ টাকা যখন পাবেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে, তখন এর ইমপ্যাক্ট যে কতটা ব্যাপক হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কার্ডের মূল কাজ তো তার বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদির জোগাড়, সে পাবে সরকারের নির্দিষ্ট দোকান থেকেই। ওই আড়াই হাজার টাকা সারা বছরের জন্য একজন কৃষকের জন্য কিছুই না, বলতে গেলে কিন্তু তা যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জোগাবে, তার মূল লক্ষ টাকায়ও মেটানো যাবে না। সংকটকালো ওই প্রণোদনা আমাদের কৃষকজীবনে পান্তা-ইলিশের মতো নগরজীবনের রসালো ইচ্ছার মতো কাজ করবে। নগরে-মহানগরে পান্তা ভাত আর ভাজা ইলিশের টুকরো বিনোদনের উৎস আর গ্রামের কৃষকের পাতে পান্তা আর কাঁচামরিচ, নুনই তার সকালের সেরা খারার, প্রতিদিনের স্বাদ। পেট ঠা-া থাকলে সারা দিনের সূচনাটাও ভালো হয়, ভালো থাকে। এটা কৃষকের বিলাস নয়, তার জীবনের অংশ। আর যা জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক তাই তো সংস্কৃতি। আমরা যা কিছু করি, যা কিছু সৃষ্টি করি, চর্চা করি, তাই আমোদের সংস্কৃতি। আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা। এই চর্চা হাজার বছরের হলেও তা আজ নতুন রূপ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এবারকার নববর্ষের শোভাযাত্রার মোটিফগুলো নির্বাচন জীবন-উপযোগী হয়েছে। বিশেষ করে মোরগ ও পায়রার মোটিফ। তবে এর সঙ্গে থাকতে পারত লাঙল, ধান, পাট, বাঘ ও হরিণের মোটিফ। এগুলো নিত্যচর্চার অংশ। আমরা কি আমাদের যুক্তিগুলোকে সাজাব না? যা যুক্তির ঊর্ধ্বে, তাকেও তো জনজীবনের জায়গা দিতে হবে। মনে রাখতে বলি ঢাকাই কেবল একমাত্র শহর নয়। দেশের ৮৫ হাজার গ্রামের একমাত্র শহরও কিন্তু তা নয়। গ্রামই আমাদের মৌলিক কেন্দ্র, ফসলের, মঙ্গলের, কল্যাণ আর অর্জনের পৃথিবী। সেই পৃথিবীর মানুষদের আনন্দ যেন সাংবৎসরিক হয়, সেই কাজই করছেন তারেক রহমান। তাকে অভিবাদন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

mahboob.hasan08@gmail.com