বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইতোমধ্যেই শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে। যে রোগটি কার্যকর টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছিল, সেটিই নতুন করে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয় এটি আমাদের নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফল। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার ‘বেসিক রিপ্রোডাকশন নাম্বার’ ১২ থেকে ১৮ অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, কেন টিকাদান ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন সম্পূর্ণভাবে একটি সংকট মোকাবিলায় ব্যস্ত ছিল, তখন শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কিন্তু মহামারী-পরবর্তী সময়ে সেই ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় জোরালো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা হামের পুনরুত্থানের প্রধান কারণ। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন উঠে আসে। ভাইরাসের মিউটেশন কি এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে? কোভিড-১৯ আমাদের শিখিয়েছে, ভাইরাস টিকে থাকার জন্য ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন করে। ডেলটা, ওমিক্রনের মতো ভ্যারিয়েন্ট তারই উদাহরণ। যদিও হামের ক্ষেত্রে এখনো টিকা-প্রতিরোধী শক্তিশালী ভ্যারিয়েন্টের প্রমাণ সীমিত, তবুও এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যায় না।
এর ফলে, জরুরি হয়ে উঠেছে জিনোম সিকোয়েন্সিং। দেশে কতগুলো ল্যাব এই সক্ষমতা রাখে, তা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ; তেমনি সংগৃহীত তথ্যের ব্যবহারও সীমিত। শক্তিশালী কার্যকর ‘জিনোম নজরদারি নেটওয়ার্ক’ ছাড়া, ভবিষ্যতের ভাইরাস হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বর্তমান এবং অতীতে, অনেকবার বিভিন্ন সংকটে নগ্ন হয়ে উঠেছিল। সংক্রামক রোগের জন্য পৃথক আইসোলেশন ইউনিট, পর্যাপ্ত আইসিইউ বেড, প্রশিক্ষিত জনবল এসব এখনো অনেক হাসপাতালে অনুপস্থিত। ফলে একদিকে রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে হাসপাতাল নিজেই সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। জনস্বাস্থ্যের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই অব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্যদিকে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা এই রোগগুলো প্রতি বছরই বাংলাদেশে মৌসুমি মহামারীর রূপ নেয়। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে এদের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও, বাস্তবে প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত বছরের শুরু থেকেই। কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েও মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট। নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, নির্মাণস্থলের অযত্ন সব মিলিয়ে এডিস মশার বংশবিস্তার অব্যাহত রয়েছে। এই অবহেলা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আসন্ন জুলাই-আগস্টে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু টিকার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্রাজিল, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে টিকা প্রয়োগ বা পরীক্ষামূলক ব্যবহারে এগিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে ‘প্রক্রিয়াধীন’ অবস্থার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। স্বাস্থ্য খাতে এই দীর্ঘসূত্রতা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
ভাইরাসজনিত রোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো রক্তবাহিত ও যৌনবাহিত সংক্রমণ যেমন এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি ও সি নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। দীর্ঘদিন উপসর্গহীন থেকে লিভার সিরোসিস বা ক্যানসারের দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগগুলোর বিস্তার থাকলেও, এখনো জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর স্ক্রিনিং কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি। ফলে সংক্রমণ অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া জুনোটিক রোগ অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো, সংক্রমণ বর্তমান বিশ্বের জন্য একটি বড় হুমকি। নিপা ভাইরাস তার একটি বাস্তব উদাহরণ। খেজুরের কাঁচা রসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর বিষয়টি বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। তবুও এই বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত সীমিত। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আনতে কার্যকর প্রচারণার অভাব স্পষ্ট। সবচেয়ে ভয়াবহ যে প্রবণতা নীরবে আমাদের গ্রাস করছে, তা হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (অগজ). অ্যান্টিবায়োটিকের মতো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, অসম্পূর্ণ ডোজ, ভেজাল ওষুধ সব মিলিয়ে এর ফলে জীবাণু ও ভাইরাসগুলো ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।
বিশ^ব্যাপী ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অগজ-এর কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ক্যানসারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ কোনোভাবেই প্রবল ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। এমন প্রেক্ষাপটে করণীয় নির্ধারণে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। প্রথমত, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে জরুরি ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে। ‘মিসড চাইল্ড’ শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দেশে জিনোম সিকোয়েন্সিং সুবিধা বাড়িয়ে ভাইরাস নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, মশক নিধন কার্যক্রমকে বছরব্যাপী পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। শুধু বর্ষার আগে ‘অভিযান’ চালিয়ে দায়সারা কাজ করলে চলবে না। পঞ্চমত, যৌন ও রক্তবাহিত রোগের জন্য জাতীয় পর্যায়ে স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণ জরুরি। ষষ্ঠত, জুনোটিক রোগ প্রতিরোধে ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি গ্রহণ করে মানব, প্রাণী ও পরিবেশ এই তিনটি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে একটা কথা বলতেই হয়, জনসচেতনতা ছাড়া কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে সংক্রামক রোগ, টিকাদান, স্বাস্থ্যবিধি ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক সচেতনতামূলক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই একটি চলমান যুদ্ধ। এখানে অবহেলা বা বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানের গাফিলতি আগামী দিনের মহামারীর বীজ বপন করবে।
যে কারণে এই মুহূর্তে প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সততার সঙ্গে কঠোর বাস্তবায়ন। সময় কিন্তু দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সতর্ক না হলে, ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে কোনভাবেই কালক্ষেপন করবেন না। এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন হচ্ছে, দেশব্যাপী ভাইরাসের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। এ জন্য গণমাধ্যমে নিয়মিত যুগোপযোগী প্রচারণা চালাতে হবে। না হলে কোনোভাবেই ভাইরাস আক্রমণ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
লেখক: ওষুধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ক্ল্যাসিফাইড স্পেশালিস্ট আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ
khoshroz@yahoo.com