ফ্রান্স সরকার অভিবাসন ও রেসিডেন্স পারমিট ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দীর্ঘসূত্রতা কমানো, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি নাগরিকদের আইনগত অধিকার আরও সুরক্ষিত করা।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ন্যুনেজ ফরাসি দৈনিক লো ফিগারোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিপুল সংখ্যক জমে থাকা আবেদনের কারণে রেসিডেন্স পারমিট নবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে। এতে অনেক অভিবাসী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারমিট নবায়ন করতে না পেরে বৈধ অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। নবায়ন সময় অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের গড় সময় ১১৭ দিন থেকে কমিয়ে ৫৫ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে কিছু প্রিফেকচারে এই সময় ১২০ দিনেরও বেশি।
লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি পদক্ষেপ : দেশজুড়ে প্রিফেকচারগুলোতে ৫০০ অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে যা প্রশাসনিক জনবল প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করবে। জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তিতে ২ মিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত বাজেট ধরা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৯ লাখ ৫৫ হাজার নবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির ও ৩ লাখ ৬৬ হাজার পারিবারিক ক্যাটাগরির।
আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করতে নতুন পরিকল্পনায় বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন- ঠিকানা পরিবর্তন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা পুনর্গঠন, অতিরিক্ত নথি গ্রহণ সীমিতকরণ, ‘রেসিপিসে’র (অস্থায়ী সনদ) স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি, বায়োমেট্রিক ডেটা সংরক্ষণ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা। এ ছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, যেমন চ্যাটবট ব্যবহারের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশিদের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এনইএফ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া এনইএফ প্ল্যাটফর্মটি দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি ত্রুটি ও জটিলতার জন্য সমালোচিত। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা সময়মতো আবেদন বা নবায়ন করতে না পেরে অনিচ্ছাকৃতভাবে অনিয়মিত অবস্থায় চলে যাচ্ছেন। অধিকার রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, প্রায় ৪৫ শতাংশ অভিযোগ অভিবাসীদের অধিকারসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম সমস্যার কারণে হাজার হাজার মানুষ বৈধ অবস্থান হারাচ্ছেন।
চলতি বছরের ১০ এপ্রিল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কঁসেই দেতা এনইএফ সংক্রান্ত ত্রুটি নিয়ে শুনানি করে। সেক্যুলার ক্যাথলিক ও এমাউসসহ ১০টি মানবাধিকার সংগঠন এ বিষয়ে আবেদন জানায়। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, ডিজিটাল ত্রুটির কারণে অভিবাসীদের আইনগত অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের কর্মসংস্থান, সামাজিক সেবা ও বসবাসের অধিকারকে প্রভাবিত করছে।
জালিয়াতির ঝুঁকি অনুযায়ী ফাইল যাচাইয়ের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ফ্রান্সে প্রায় ৪৫ লাখ বিদেশি নাগরিক বৈধ রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে বসবাস করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.১ শতাংশ। নতুন এই সংস্কার পরিকল্পনা একদিকে প্রশাসনিক জট কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ।