আল্লাহর ৯৯ নাম আয়ত্তে জান্নাত

গত শুক্রবার মসজিদে নববির জুমার খুতবায় শায়খ ড. খালেদ ইবনে সুলাইমান আল-মুহান্না মহান আল্লাহর পরিচয় ও তার সুন্দর নামসমূহের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা, যা পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব কেবল তাকে চেনার মাধ্যমেই। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি জানলে তার প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি পায়। তার ৯৯টি নাম আয়ত্তকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে। এই জ্ঞান মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং পাপাচার থেকে দূরে রাখে।

শায়খ বলেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! মানুষকে সৃষ্টিগতভাবেই সুন্দর জীবনের প্রত্যাশী এবং সৌভাগ্যের অন্বেষণকারী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। আর এটি কেবল তখনই সম্ভব, যখন সে তার রবের প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা, বিনয় এবং তার আদেশের আনুগত্যের মাধ্যমে নিজেকে সঁপে দেবে। জিন ও মানবজাতি সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদত করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)

প্রকৃতপক্ষে বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার ইবাদতকারী হতে পারে না, যতক্ষণ না সে তার রবকে চিনতে পারে। যে ব্যক্তি তার রব সম্পর্কে যত বেশি জানবে, সে তার তত বেশি ইবাদত করবে। এ কারণেই মহান আল্লাহ রাসুলদের পাঠিয়েছেন এবং কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যেন মানুষ তাদের মালিক ও প্রতিপালক সম্পর্কে জানতে পারে। এই জ্ঞানই হলো শ্রেষ্ঠ, উচ্চতর ও মর্যাদাপূর্ণ জ্ঞান। নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহকে জানাই হলো ইসলামের মূল ভিত্তি এবং ইমানের মূল স্তম্ভ। আর এই মারেফত বা পরিচয় লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো আল্লাহর নাম, গুণাবলি ও কার্যাবলি সম্পর্কে জানা। এই জ্ঞানই বান্দাকে তার প্রভুর মহব্বত, মহিমা ও বিনয়ের দরজায় পৌঁছে দেয়। বান্দা যত বেশি তার রবকে জানবে, তার প্রতি ভালোবাসা তত বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এ কারণেই রাসুলগণ ছিলেন আল্লাহর প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা পোষণকারী এবং তাদের মধ্যে ইবরাহিম (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সবার শীর্ষে।

হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহর পরিচয়ের মাধ্যমেই আত্মা পূর্ণতা পায়, পরিশুদ্ধ হয় এবং অনাবিল শান্তি লাভ করে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নিজের সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন, তার নাম, গুণ ও কাজ সম্পর্কে যা জানিয়েছেন এবং আসমান-জমিনে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলোর সবকিছুর মাধ্যমেই তিনি বান্দার কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন। তার অগণিত প্রকাশ্য ও গোপন নেয়ামত এ কথাই প্রমাণ করে যে, তার অত্যন্ত সুন্দর নাম ও পরিপূর্ণ গুণাবলি রয়েছে। তার প্রতিটি কাজ দয়া, কল্যাণ, হেকমত ও ইনসাফে ভরপুর। তিনিই দুনিয়া-আখেরাতে এবং আসমান-জমিনে প্রশংসিত হওয়ার একমাত্র যোগ্য। তার গুণগানই তার প্রতি নিখুঁত ভালোবাসা তৈরি করে। তিনি সর্বাধিক স্মরণ ও প্রশংসার দাবিদার। নিজের পবিত্র সত্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আসমান ও জমিনে সর্বোচ্চ মর্যাদা তারই এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা রুম ২৭)

মহান আল্লাহ তার বান্দাদের নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তারই জন্য রয়েছে সব সুন্দর নামসমূহ।’ (সুরা তাহা ৮) তার নামসমূহ সৌন্দর্যের চূড়ান্ত শিখরে আসীন। এই নামগুলো হৃদয়ে ও শ্রবণে এক গভীর প্রভাব তৈরি করে, কারণ এগুলো আল্লাহর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণাবলি বহন করে। প্রতিটি নামই আল্লাহর এমন এক পরিপূর্ণতার গুণ প্রকাশ করে, যেখানে কোনো খুঁত নেই। মহান আল্লাহ নিজের জন্য এই নামগুলো পছন্দ করেছেন এবং বান্দাদের সামনে প্রকাশ করেছেন, যেন তারা এগুলোর অর্থ নিয়ে চিন্তা করে এবং এর মাধ্যমে তার ইবাদত করে। বান্দাদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব সুন্দর নাম, সুতরাং তোমরা তাকে সেসব নামেই ডাকো।’ (সুরা আরাফ ১৮০) এখানে ডাকার অর্থ হলো, প্রশংসা ও ইবাদতের মাধ্যমে তাকে ডাকা এবং সেই নামের অসিলায় নিজের প্রয়োজন পূরণের দোয়া করা।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহর সুন্দর নামের সংখ্যা অনেক, যার সংখ্যা কেবল তিনিই জানেন। রাসুল (সা.)-এর একটি দোয়া থেকে এটি স্পষ্ট হয়, যেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনার কাছে আপনার ওই প্রতিটি নামের অসিলায় চাই, যে নামে আপনি নিজেকে নামকরণ করেছেন, অথবা আপনার কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন, অথবা আপনার সৃষ্টির কাউকে শিখিয়েছেন কিংবা আপনার অদৃশ্যের জ্ঞানে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ) তবে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের কাছে কিছু নাম প্রকাশ করেছেন এবং সেই নামের স্মরণের বিনিময়ে জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর ৯৯টি নাম রয়েছে, এক কম একশ। যে ব্যক্তি এগুলোকে আয়ত্ত করবে (হেফাজত বা আমল করবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ বুখারি) এই আয়ত্ত করার অর্থ হলো, নামগুলো মুখস্থ করা, অর্থ বোঝা এবং তা অনুযায়ী মহান আল্লাহর মহিমা ও নির্দেশ পালনের মাধ্যমে তার ইবাদত করা।

আসমাউল হুসনার (আল্লাহর গুণবাচক সুন্দর নামসমূহ) মূল ভিত্তি হলো ৫টি নাম, যা সুরা ফাতিহায় বর্ণিত হয়েছে এবং আল্লাহর সব নাম এই ৫টি নামের দিকেই ফিরে আসে।

এক. আল্লাহ : এটি তার মহান নাম, যা সব নামের অর্থ ও গুণের সমষ্টি। এর অর্থ যিনি পরম মাবুদ, সৃষ্টির প্রতি যার সার্বভৌমত্ব রয়েছে এবং সৃষ্টিজগৎ যাকে ভালোবেসে ও ভয় পেয়ে সেজদা করে। এই নাম আল্লাহ অন্য কারও জন্য রাখা হারাম করেছেন। এটিই ইমানের সূচনা ও ইসলামের স্তম্ভ।

দুই. রব : যিনি রুবুবিয়্যতের (প্রতিপালন) সব গুণের অধিকারী। জগতের প্রতিটি সৃষ্টি তার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের কাছে অবনত। তিনি সবকিছুর মালিক ও পরিচালক। তিনি নেয়ামত দিয়ে বান্দাদের লালন করেন এবং হেদায়েত ও পবিত্রতা দিয়ে তার প্রিয় বান্দাদের আত্মিকভাবে লালন-পালন করেন।

তিন. আর-রহমান : ‘আর-রাহমান’ নামটি কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি বলেন, ‘বলো, তোমরা আল্লাহ নামে ডাকো অথবা রাহমান নামে ডাকো, যে নামেই ডাকো না কেন, সব সুন্দর নাম তো তারই।’ (সুরা ইসরা ১১০)

আল্লাহ দয়াময় ও পরম দয়ালু। তার রহমত ও করুণা সব সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে। তিনি তার রহমতেই আসমানি কিতাব ও রাসুল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।’ (সুরা আর-রাহমান ১-৪)

চার. রহিম : ‘রাহিম’ হলো বিশেষ রহমত, যা কেবল মুমিনদের জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা আহজাব ৪৩) এই রহমতের কারণেই তিনি মুমিনদের ইবাদতের পথ দেখান এবং জান্নাতে প্রবেশ করান। আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে জান্নাত সম্পর্কে বলেছেন, ‘তুমি আমার রহমত, তোমার মাধ্যমে আমি যার ওপর চাই দয়া করি।’ (সহিহ বুখারি)

পাঁচ. মালিক : আল্লাহ বিচার দিবসের মালিক ও অধিপতি। আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব কেবল তারই। দুনিয়া ও আখেরাতে নির্দেশ ও বিচারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তারই। জগতের সবাই তার দাস। ‘আল-মুহাইমিন’, ‘আল-আজিজ’, ‘আল-জাব্বার’, ‘আল-মুতাকাব্বির’-এর মতো সব প্রতাপশালী নাম এই ‘মালিক’ নামেরই অন্তর্ভুক্ত।

হে মুসলিম ভাইয়েরা! মহান আল্লাহ তার নাম ও গুণাবলিকে ভালোবাসেন এবং ওই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যে এই নামগুলোকে ভালোবাসে এবং তা দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর প্রধান করে পাঠালেন। তিনি নামাজে কেরাত শেষ করার পর প্রতিবার ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস) পড়তেন। ফিরে আসার পর সাহাবিরা বিষয়টি রাসুল (সা.)-কে জানালে তিনি বললেন, ‘তাকে জিজ্ঞেস করো তিনি কেন এমন করেন?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘কারণ এতে দয়াময় আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনা করা হয়েছে, আর আমি এটি পড়তে ভালোবাসি।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাঁকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ বুখারি)

হে আল্লাহর বান্দারা! যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম ও গুণাবলির পরিচয়ে মনোনিবেশ করবে, তার অন্তর প্রশান্তিতে ভরে উঠবে এবং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। তখন আল্লাহ ছাড়া তার কাছে প্রিয় আর কিছু থাকবে না। পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করলে বান্দা এমন এক রবের দেখা পায়, যার মধ্যে সব মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান। আল্লাহর এই পরিচয় বান্দার হৃদয়ে মহব্বত, ভয় ও বিনয় তৈরি করে।

আল্লাহর দয়া ও ইহসানের গুণগুলো বান্দার মনে আশার সঞ্চার করে, ফলে সে নেক আমলে উৎসাহিত হয়। আবার আল্লাহর ইনসাফ ও শাস্তির গুণগুলো বান্দার মনে আল্লাহর ভয় তৈরি করে, যা তাকে পাপাচার ও নফসের দাসত্ব থেকে দূরে রাখে। আল্লাহর জ্ঞান ও উপস্থিতির গুণগুলো বান্দার কাজে একনিষ্ঠতা ও লজ্জা তৈরি করে। আর আল্লাহর রিজিক ও সাহায্যের গুণগুলো তার ওপর ভরসা ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। সর্বোপরি তার শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের গুণগুলো বান্দাকে বিনয়ী করে তোলে।

হে আল্লাহ! আমরা আপনার সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলির অসিলায় আপনার নেয়ামত এবং আপনার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা চাই। আমরা আপনার অনুগ্রহে আপনার দিদারের স্বাদ ও আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রার্থনা করি।

হে মুসলিম সম্প্রদায়! আপনাদের রবের নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তার পবিত্র পরিবারবর্গের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! আপনি চার খলিফা হজরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলি (রা.) এবং সব সাহাবিদের ওপর সন্তুষ্ট হোন। আমাদের ও আমাদের পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন।

১০ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান