দুই কবির পুনর্মিলন

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারির দরজা দিয়ে ঢুকতেই ফ্রেমে বাঁধানো বিশাল বড় একটি সাদাকালো ছবি। স্কয়ার ফরমেট ছবির জমিনে পিঠাপিঠি দাঁড়ানো বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম দুই কবি শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ। শামসুর রাহমানের গায়ে একটা ঘিয়ে সাদা পাঞ্জাবি। ডান কাঁধে শাল জড়ানো। শালটি কাঁধ থেকে নেমে গেছে পা পর্যন্ত। আল মাহমুদের গায়ে কালো কোট। তার ডান হাতে ধুমায়িত সিগারেট। আর বাঁ হাতে একটা কাগজ। দুজন দুদিকে তাকানো। স্বতঃস্ফূর্ত। ছবিটির ফোরগ্র্যাউন্ডে কারুকার্যময় পুরনো একটা রেলিং। আর ব্যাকগ্র্যাউন্ডে বাড়ির সিড়ির পাশে যে ব্যালকনি, তার ওয়াল। ১৯৮৫ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউর একটি বিখ্যাত বাড়িতে ছবিটি তোলা। ইয়াসিকা ওয়ান টুয়েন্টি ম্যাট ক্যামেরা ও সাদাকালো আগফা ফিল্মে এই দুই কবির অভূতপূর্ব মুহূর্তটি ধারণ করেন আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন।

এই ঐতিহাসিক ছবিটি নিয়ে গত ১০ এপ্রিল বিকেলে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের ব্যাক ইয়ার্ডে আমার সঙ্গে কথা বলেন নাসির আলী মামুন। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় একটা কবি সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন কবি যোগদান করেন। নাসির আলী মামুনও যান তাদের সঙ্গে। ঘুরে বেড়ান কলকাতা, শান্তিনিকেতনসহ বিভিন্ন জায়গায়। বাংলাদেশের কবিদের সম্মানে এক বিশেষ আড্ডার আয়োজন করেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বিমল চন্দ্র বসাক (বি সি বসাক)। বি সি বসাক বাঙালি। তিনি আর্ট ও সংগীতের সমঝদার ছিলেন। তার স্ত্রী সুনন্দা বসাক ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। কবিদের সঙ্গে বি সি বসাকের গভীর সম্পর্ক ছিল, বিশেষ করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সমরেশ বসুর সঙ্গে। তার বাড়িতে দুটি অনুষ্ঠান হতো। একটা বুধ সন্ধ্যা, আরেকটা শনিবারের আড্ডা। এই বাড়ির আড্ডায় দুই বাংলার শীর্ষ ৪০ কবি উপস্থিত। সেই আড্ডায় শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ দুজন দুই দিকে। কারও সঙ্গে কারও কথা নেই। শামসুর রাহমানের সঙ্গে সবাই মিশছেন, গল্পস্বল্প করছেন। কিন্তু আল মাহমুদ অনেকটা নিষ্প্রভ। তার সামনে লোকজন খুব একটা আসে না। ব্যাপারটা নাসির আলী মামুনের কাছে খুব বেখাপ্পা মনে হলো। বাংলা সাহিত্যের এই দুই কবির মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য নিয়ে একটা ছবি তোলার আইডিয়া তার মাথায় আসল। তিনি আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানকে বললেন। দুজনই সহাস্যে রাজি। বি সি বসাকের চারতলা বাড়ির সিড়ির পাশের ব্যালকনিতে তিনি দুই কবিকে নিয়ে এলেন। ভেতরে তখন পানাহার চলছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সমরেশ বসু তখন পানাহারে ব্যস্ত।

শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশাপাশি দাঁড়ালেন। দুই কবি যখন পিঠে পিঠ রাখলেন তখন কলকাতার ওই বাড়িতে বড় একটা ভূমিকম্প হলো। ভালো কম্পন হলো। সাংঘাতিক ঝাঁকুনি হলো। পানাহারের মধ্যে বিষয়টা কেউ টের পেলেন না। শক্তি-সুনীলও টের পেলেন না। টের পেলেন নাসির আলী মামুন। শক্তির মতো কবি, সুনীলের মতো কবি বাংলা কবিতার পরিণাম কোন দিকে যাচ্ছে, এই দুজন জানে। পশ্চিম বাংলার তুলনায় যে বাংলা কবিতা, ফোকলোর, কথাসাহিত্য যে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা তাদের অজানা নয়। শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ তাদের শরীরের যে উত্তাপ, সেই উত্তাপ বাংলা কবিতার একটা বিরহের মধ্যে থেকে, বিচ্ছেদের মধ্যে থেকে হঠাৎ এক হয়ে গেছে। মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্যের পর এই যে দুই কবির পুনর্মিলন এটা বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটা অনন্য ঘটনা।

এই যে দুই কবির পিঠাপিঠি ছবি, সেই ছবি তোলার ডিউরেশন ছিল পাঁচ মিনিটের কম। এই সময়ে আল মাহমুদ ও শামসুর রহমান ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল। কারণ, তারাও কম্পনটা বুঝতে পেরেছিলেন। ছবি তোলার সময় শামসুর রাহমান বলেছেন, ‘তুমি নাসির আলী মামুন, তুমি শুধু ছবি না; ইতিহাস ধারণ করো।’ আর আল মাহমুদ বলেছেন, ‘আমি তো টের পাইছি তোমার মতলব।’ কলকাতায় যাওয়া নাসির আলী মামুনের জন্য তখন একটা ফ্রন্টিয়ার উদ্বোধন হয়েছিল বলা যায়। কবিদের সঙ্গে তিনি কলকাতায় এগারো দিন ছিলেন। এই সময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা তার ক্যামেরা কখনো বিশ্রামে ছিল না।

এই ঘটনার ২০ বছর পর নাসির আলী মামুন আরেকটা ভূমিকম্প সৃষ্টি করলেন। আর এটা সৃষ্টি করতে তার চার বছর সময় লাগে। শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদকে তিনি কোনোভাবেই একত্র করাতে পারছিলেন না। শেষে ২০০৪ সালের ৩১ অক্টোবর দিন তারিখ ঠিক হলো। আল মাহমুদকে গুলশানের বাসা থেকে স্কুটারে করে তিনি রওনা হলেন শামসুর রাহমানের শ্যামলীর বাসার দিকে। তখন রমজান মাস। যেতে যেতে বিকেল হয়ে গেল। স্কুটারে বসে আল মাহমুদ বেশ নস্টালজিক। শামসুর রাহমানের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। আল মাহমুদকে দেখে শামসুর রাহমান একবারে অপ্রস্তুত। ফ্যাকাসে মুখে তিনি আল মাহমুদের হাত স্পর্শ করলেন। এই যে দুজনের হাতের স্পর্শ তখন ঢাকার শ্যামলীতে আবারও একটা ভূমিকম্প হলো। শামসুর রাহমানের বাসায় প্রথম আল মাহমুদ গেছেন। দীর্ঘ দিন পরে তাদের শরীরের যে স্পর্শ, সেটি অনুভব করলেন নাসির আলী মামুন। তিনি কাঁপছেন কিন্তু তার ক্যামেরা কাঁপছে না। তিনি ঠাস ঠাস ছবি তুললেন। শামসুর রাহমান একটি চেয়ারে বসলেন। পাশের চেয়ারে বসলেন নাসির আলী মামুন। দুটাই চেয়ার। আল মাহমুদ বসলেন বিছানায়। শামসুর রাহমানের তখন আরও অস্বস্তি। দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে প্রশ্ন শুরু করলেন নাসির আলী মামুন। দুজনেই উত্তর দিচ্ছেন। হঠাৎ করে আল মাহমুদ রুমে সিগারেট ধরালেন। শামসুর রাহমান তো সিগারেট খান না। তিনি খুবই বিরক্ত কিন্তু কিছু বলছেন না। কিন্তু তার শারীরিক ভাষায় বোঝা যাচ্ছে। নাসির আলী মামুন ওই দিকে কোনো কেয়ার করছেন না। তার দরকার দুই কবিকে মুখোমুখি বসিয়ে প্রশ্ন করা, যা তারা কোনো দিন বলে নাই। বিভিন্ন প্রশ্নে তারা একমত হতে পারছেন না। ধর্ম নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, বাংলা ভাষার ব্যাপারে তাদের চিন্তা সম্পূর্ণ আলাদা। এরমধ্যে সাইরেন বেজে ওঠে। ইফতারের সময়। শামসুর রাহমানের পুত্রবধূ টিয়া রহমান ইফতারি দিয়ে যান। আজান দিচ্ছে। আল মাহমুদের নামাজ পড়ার সময়। তিনি টুপি মাথায় দিয়ে জায়নামাজ খুঁজছেন। শামসুর রাহমানের রুমে কোনো জায়নামাজ নাই। পরে ভেতরের রুম থেকে জায়নামাজ এলো। শামসুর রাহমানের শয়নকক্ষে জায়নামাজ পেতে তিনি নামাজ শুরু করলেন। শামসুর রহমান একটা প্লেটের মধ্যে খাচ্ছেন আর অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন।

নাসির আলী মামুনের ক্যামেরা তাক করা। নামাজের সময় শামসুর রাহমান নাসির আলী মামুনকে বললেন, ‘এই মালটাকে নিয়ে যাও। এই মালটাকে নিয়ে যাও।’ কথাটা দুবার বললেন। নাসির আলী মামুন শুনেও না শোনার ভান করলেন। কারণ তার তো ইন্টারভিউ শেষ হয় নাই। দুজনের ভেতরের যে কাহিনি, যা তারা কোনো জায়গায় লেখে নাই, যা তাদের হৃদয়ের ভেতরে, স্মৃতির মধ্যে রয়ে গেছে, তা তিনি টেপ রেকর্ডারে লিপিবদ্ধ করছেন। এই দিকে রাত সাড়ে ৮টা বেজে গেল। খাওয়া-দাওয়ার কোনো আয়োজন নাই। নয়টা যখন বেজে গেছে। নাসির আলী মামুন শামসুর রাহমানকে বললেন, ‘মাহমুদ ভাইকে তো বাসায় দিয়ে আসতে হবে। বয়স্ক লোক। উনি ঘুমাবে, খাবে। ভোর রাত্রে উঠবে সেহরির জন্য।’ শামসুর রাহমান কিছু বললেন না। তখন তিনি আল মাহমুদকে বললেন, ‘মাহমুদ ভাই চলেন আমরা চলে যাই। এখন না গেলে পরে আর সিএনজি পাওয়া যাবে না।’

দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই কবির ছবি তুলেছেন নাসির আলী মামুন। হাজার হাজার ছবির মধ্য থেকে ৫৮টি ছবি দিয়ে এই প্রদর্শনী ‘ফটোজিয়াম : লাইফ অব পোয়েট্রি’। পোয়েট্রি মানে কবিতা না। পোয়েট্রি মানে কবিতার বৃক্ষ। যেমন ফটোগ্রাফি ও মিউজিয়ামকে একসঙ্গে করা ‘ফটোজিয়াম’। ফটোগ্রাফির দুইশ বছর উদযাপন উপলক্ষে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। শুরুতে যেই ছবিটার কথা বলা হচ্ছিল, সেই ছবিটার পাশে হেঙ্কারে টাঙানো শামসুর রাহমানের একটা শার্ট। সেই শার্ট বাতাসে উড়ছে, এসির বাতাসে নড়ছে। নাসির আলী মামুনকে যখন শার্টটা উপহার দেওয়া হয় তখন শামসুর রাহমান শার্টের উপরে উনি লেখেন ‘আমাকে ভুলে গেলে ক্ষতি নেই। আমার কবিতাকে মনে রেখো।’ সেই লেখার উপরে শামসুর রাহমান নুয়ে পড়া, রোগা বকের মতো একটা পাখির ছবি আঁকলেন। ছবিটা দেখে বোঝা যায়, শামসুর রাহমান একজন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলেন। বাংলাদেশের কবিতা এবং সংস্কৃতির পরিণাম কী হবে এটা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।