কানাডায় আবারও ইতিহাস গড়লেন ডলি বেগম

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী এমপি নির্বাচিত হন নরওয়ের সায়রা খান ২০০৫ সালে। ২৬ বছর বয়সে, ছাত্রাবস্থায় এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি পথিকৃৎ হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক, রূপা হক এবং আফসানা বেগম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফিনল্যান্ডে বাংলাদেশের মেয়ে নাসিমা রাজমিয়ারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বার্লিনে প্রাদেশিক সংসদের সদস্য ছিলেন সাওসান শিবলি। সেই তালিকায় কানাডা থেকে এবার যুক্ত হলেন ডলি বেগম।

পুরুষদের মধ্যে স্কটল্যান্ডের সংসদ সদস্য হিসেবে ফয়সল হোসেন চৌধুরী একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি। হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী ফয়সল ২০২১ সালের ৬ মে অনুষ্ঠিত স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। গত ৮ এপ্রিল তিনি মেয়াদ পূর্ণ করেন।

বহুসাংস্কৃতিক দেশ কানাডা। সেই কানাডার রাজনীতিতে নতুন ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন ডলি বেগম। টরন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের উপনির্বাচনে তার বিপুল বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের গর্বিত প্রতিফলন। ভারতীয়-পাকিস্তানি-শ্রীলংকান বংশদ্ভূত কানাডিনার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও প্রথম বারের মতো বাংলাদেশি হিসেবে বিজয়ের পতাকা উড়ালেন।

লিবারেল পার্টি অব কানাডার প্রার্থী হিসেবে গত ১৩ এপ্রিল ডলি বেগম মোট ২৮ হাজার ৭৭৮ ভোটের মধ্যে ২০ হাজার ১১৪ ভোট অর্জন করে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেন। প্রায় ৬৯.৯ শতাংশ ভোট পাওয়া এই বিজয় শুধু পরিসংখ্যানগত নয়—এটি ভোটারদের আস্থা, বিশ্বাস ও প্রত্যাশার শক্তিশালী প্রকাশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক পিছিয়ে পড়েন, যা প্রমাণ করে জনগণ একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর নেতৃত্বের প্রতি স্পষ্ট সমর্থন দিয়েছে। এই ফলাফল ডলির মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও জনপ্রিয়তারও প্রমাণ বহন করে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সমর্থক, পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে আনন্দ ও আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিজয় যেন কোনো একক ব্যক্তির নয়—এটি পুরো কমিউনিটির, বিশেষ করে বাংলাদেশি-কানাডিয়ানদের জন্য এক ঐতিহাসিক গর্বের মুহূর্ত। আবহমান বাংলা ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী উৎসবের সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত করে ডলির এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়।

বিজয় ভাষণে ডলি বেগম যে বার্তা দেন, তা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সারাংশ তুলে ধরে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি শুধু যারা তাঁকে ভোট দিয়েছেন তাদের নন, বরং পুরো এলাকার মানুষের প্রতিনিধি। এই বক্তব্যে তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অঙ্গীকার ফুটে ওঠে। তবে ভাষণের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল, যখন তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামী ব্যারিস্টার রিজওয়ান রহমানকে স্মরণ করে এই বিজয় উৎসর্গ করেন— যা পুরো পরিবেশকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হলেও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা অতুলনীয়। তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে, দল পরিবর্তন করেও তিনি নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এই নির্বাচনে তাঁর প্রাক্তন উত্তরসূরি সাংসদ বিল ব্লেয়ারের চেয়েও প্রায় ৯% বেশি ভোট পেয়েছেন। গুণবতী ডলি অন্তরকিতায় তার প্রতিপক্ষ্রাও মুগ্ধ। তার প্রমাণ, ওন্টারিও প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড নির্বাচনের আগে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, শি ইজ গুড, বেরি গুড, বেরি নাইচ!

এই ঐতিহাসিক অর্জনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার মতে, এটি একটি আরও ন্যায়পরায়ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কানাডা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডলির বিজয়ে লিবারেল পার্টি আরও একটি সাফল্য অর্জন করেছে এবং পার্লামেন্টে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট ছাড়াও একই দিনে আরও দুটি আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে টরন্টোর ইউনিভার্সিটি–রোজডেল আসনে ড্যানিয়েল মার্টিন এবং কুইবেকে টেরেবোন্নে আসনে তাতিয়ানা অগাস্ট নির্বাচিত হন। ফলে তিনটি আসনেই লিবারেল পার্টি জয়লাভ করে। ফলে লিবারেল সরকার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। এখন সরকারবিরোধী দলের সমর্থন ছাড়াই আইন পাস করতে পারবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট দীর্ঘদিন ধরেই লিবারেলদের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবারের বিজয়ের ব্যাপকতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে অভিবাসী ও বহুসাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় সমর্থন এই জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত অন্যান্য উপনির্বাচনেও লিবারেল পার্টির সাফল্য সরকারকে পার্লামেন্টে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ডলি বেগমের ব্যক্তিগত জীবনও তার রাজনৈতিক যাত্রার মতোই অনুপ্রেরণাদায়ক। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করে তিনি পরবর্তীতে কানাডায় অভিবাসন করেন। ২০১৮ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে টানা তিনবার এমপিপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি তার নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করেন।

পার্লামেন্টে তিনি অনেকটা বাংলাদেশের পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো ভূমিকা পালন করে সর্বমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এবার তিনি টরন্টোর কুইন্স পার্ক থেকে অটোয়ার কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে বিশ্বাস করা যায়। আশা করা যাচ্ছে, ডলি মন্ত্রী হবেন এবং কানাডা–বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপের চেয়ারপারসনও হতে পারেন।

রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের কাজের মধ্যে রয়েছে অভিবাসন সেবা উন্নয়ন, বিদেশি শিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন। এই বিষয়গুলো তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি, অভিবাসীদের বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা। ডলি বেগম বিশ্বাস করেন, বৈচিত্র্যের মধ্যেই কানাডার প্রকৃত শক্তি নিহিত—এবং সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তিনি একটি আরও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে চান।

ডলি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—তিনি মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাবেন। তার এই যাত্রা শুধু আজকের নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

ডলি বেগমের এই বিজয় কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়—এটি একটি বৃহত্তর গল্পের অংশ, যেখানে প্রবাসী স্বপ্ন, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি মিলেমিশে এক অনন্য সাফল্যের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের এবং বাঙালিদের জন্য গর্বের।