প্রায় আট বছর পর ফের চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মোহাম্মদ মনজুর আলম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার দলবদল এবং পরে অন্তরালে চলে যাওয়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক এই মেয়রকে নিয়ে এখন কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে তার বাসায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর আড়াই ঘণ্টা অবস্থান সব জল্পনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
নগরীর কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাৎ ঘিরে চট্টগ্রামের সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে-তবে কি এনসিপির হাত ধরে আবারও রাজনীতিতে ফিরতে যাচ্ছেন ধনাঢ্য এই ব্যবসায়ী? বিএনপির সমর্থন নিয়ে চসিক মেয়রের দায়িত্ব পালন করা মনজুর আলম কি এবার এনসিপির ব্যানারে ফের নামবেন মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে?
এসব প্রশ্ন ও কৌতূহলের খুব স্পষ্ট জবাব মিলছে না। মনজুর আলম নিজে জানিয়েছেন, এখন আর রাজনীতিতে ফেরার ভাবনা তার নেই। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারাও তাদের রাজনীতিতে মনজুর আলমকে যুক্ত করা নিয়ে মুখ খুলছেন না। তবে চট্টগ্রাম এনসিপির নেতাদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মনজুরকেই চট্টগ্রামের কাণ্ডারী করতে চান তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মনজুর আলমের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকলেও এই মুহূর্তে বিএনপির তাকে দলে ফেরানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সঙ্গেও তিনি এখন রাজনীতি করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে মনজুর আলম রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে এনসিপি তার জন্য প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অবস্থান দৃঢ় করতে এনসিপিও তাকে কাজে লাগাতে পারে।
যাকে ঘিরে এত আলোচনা, সেই মনজুর আলম কে? কেনই বা তাকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এত আলোচনা?
পেশায় মনজুর আলম একজন ব্যবসায়ী। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু আওয়ামী লীগে। চসিকের কাউন্সিলর ছিলেন দীর্ঘ ১৭ বছর। পুরোটা সময়ই যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। চসিক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ‘গুরু’ও মানতেন।
২০১০ সালে চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণ পালটে দেন মনজুর। বিএনপিতে যোগ দিয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হওয়ায় বিএনপিও পূর্ণ সমর্থন দেয় তাকে। নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন তারই ‘গুরু’ আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহিউদ্দিন। ‘গুরু মারা বিদ্যা’ প্রয়োগ করে সে নির্বাচনে জিতে আসেন মনজুর।
এরপর ২০১৫ সালেও চসিক মেয়র নির্বাচন করেন এই ব্যবসায়ী। বিএনপি আবারও সমর্থন দেয় তাকে। তবে এবার আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ জ ম নাছিরের সঙ্গে পেরে ওঠেননি তিনি। তবে নির্বাচনে হেরে বিএনপি ছাড়েন মনজুর। ফের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন।
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন মনজুর। তবে শেষ পর্যন্ত দলটি তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তার আসন চট্টগ্রাম-১০ থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করে মো. আফসারুল আমীনকে। পরে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি, তবে ভোটে জিততে পারেননি।
এনসিপির সঙ্গে মনজুর আলমের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে জানতে চাইলে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, উনি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র। দীর্ঘ সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাঝে আবার কিছুটা নিষ্ক্রিয়ও হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি আমাদের দলের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে ওনার একটি সাক্ষাৎ ও বৈঠক হয়েছে।
মনজুর আলম নিজেও এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গুঞ্জনকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, এনসিপিতে যোগ দেওয়া বা সেখান থেকে মেয়র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে যে গুঞ্জনটি উঠেছে, সেটি হয়তো আমার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী অতিরঞ্জিত করে ছড়িয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তবে চট্টগ্রাম এনসিপির একজন নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে কিছুটা ভিন্ন সুর। তার ভাষ্য, মনজুরের বাসায় হাসনাত যাওয়ার আগে এনসিপির কেন্দ্র থেকে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়-এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ও চসিক মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনজুর আলমকে নিয়ে তাদের ভাবনা কী। চট্টগ্রাম এনসিপির ওই নেতা বলেন, মনজুর আলমকে নিয়ে আমাদের আপত্তির কারণ নেই। তার মতো অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী একজন নেতা এনসিপির রাজনীতির জন্য সহায়ক হবে।