ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সাড়ে চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানে সুলভ ও সহজে চিকিৎসাসেবা পেতে আসা রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও বিপাকে পড়েন রোগ নির্ণয়ের জন্য নানা পরীক্ষা করাতে গিয়ে। গ্রামের সহজ-সরল রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। তাদের কর্মকান্ড দেখেও না দেখার ভান করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এসব দালাল চক্র খোদ চিকিৎসকদের ছত্রছায়ায় সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ ও ইমার্জেন্সি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা প্রহরি শাকিল আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের দুজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) গোলাম কিবরিয়া জাহিদ ও সোহেল রানা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে আঁতাত করে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কিংবা সাদা টোকেনে প্যাথলজি পরীক্ষার নাম লিখে দেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়া মাত্রই রোগীর হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নেয় দালালরা। রোগীদের তারা নিজেদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাঠিয়ে দেন।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে সরেজমিন দেখা যায়, রোগী ধরতে ব্যস্ত ১০ থেকে ১৫ জন দালাল। কমিশনের বিনিময়ে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা ৫-৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নিতে কাজ করছেন। সেবা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে আরও অনেক অভিযোগ। তারা জানান, কমিশনের ভাগ চিকিৎসকরাও পান।
নিরাপত্তাপ্রহরী শাকিল আহমেদ জানান, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলায় তার সঙ্গে অসদাচরণ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে গোলাম কিবরিয়া, জাহিদসহ কয়েকজন সেকমোর। তিনি জানান, গত ৯ এপ্রিল দুপুরে সেকমো গোলাম কিবরিয়া জাহিদ তাকে লাঠি নিয়ে মারতে এসেিেছলেন। দালাল চক্রের সঙ্গে টেস্ট বাণিজ্যে সেকমো জাহিদসহ কয়েকজন জড়িত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের বিপরীত পৃষ্ঠায় লিখে দেওয়া হয় চিকিৎসকের মোবাইল নম্বর। ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া নম্বরে কল দিলেই রোগী ভাগিয়ে নেওয়া হয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। শনিবার সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় ১০১৫ জন দালাল।
ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, ক্লিনিক ও ডায়াগস্টিক সেন্টার চালাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররাই। ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের পাঠিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হচ্ছে কারণে-অকারণে। দিনশেষে পকেট ফাঁকা হলেও রোগের সঠিক তথ্য নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন না তারা।
উপজেলার জাটিয়া ইউনিয়ন থেকে এক স্বজনকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা আয়শা খাতুন বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দালালরা সবসময় হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে। অনেক দালাল ডাক্তারের রুমেই বসে থাকে। চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন দেওয়া মাত্রই তারা রীতিমতো হামলে পড়ে রোগীর ওপর। কাগজ নিয়ে তাদের নিজ নিজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান পরীক্ষার জন্য। হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা।
উপজেলার মগটুলা ইউনিয়ন থেকে চর্মরোগে আক্রান্ত শিশুকন্যা তাসনিম জারাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন তার মা ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, মেয়ের মুখে দানা দানা কি যেন হয়েছে। হাসপাতালে এলে ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছে এবং ব্যবস্থাপত্রে একটা মোবাইল নম্বর লিখে দিয়েছেন। বলেছেন এই নম্বরে পরে কল দেওয়ার জন্য।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মুন্নী, মুহাম্মদ আলী, মাইশাসহ কয়েকজন রোগী জানান, হাসপাতালে এলেই নানা পরীক্ষা ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে দালালরা রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে পরীক্ষা করায় তাদের নির্দিষ্ট করা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সাধারণ মানুষ হাসপাতালে আসে সহজ ও সুলভমূল্যে চিকিৎসা নিতে। কিন্তুযদি কারণে-অকারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার লম্বা কাগজ তুলে দেওয়া হয় তা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সব ধরনের পরীক্ষা হাসপাতালে করা হলে উপকার হতো।
টেস্ট বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার গোলাম কিবরিয়া জাহিদের নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অপর উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সোহেল রানা এ বিষয়ে বলেন, ‘আমার ওপর আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমাদের কাজ রোগীদের সেবা দেওয়া, দালাল দূর করা না। দালালরা কীভাবে হাসপাতালের ভেতরে আসে?’
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন বলেন, টেস্ট বাণিজ্যে হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু বলেন, হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে বেচাকেনা ও দালালি টোটালি বন্ধ করা হবে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ নিতে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলার একটি মানুষও যেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হয়রানির শিকার না হয়, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।