উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত বৈশ্বিক তেল বাজার টালমাটাল করে দিয়েছে। দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, বিবদমান পক্ষগুলোর উত্তেজনা প্রশমনের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। গত শুক্রবার লেবাননে যুদ্ধবিরতির পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও, ট্রাম্পের ইরানি বন্দর অবরোধ জারির একরোখা সিদ্ধান্তে গতকাল শনিবার জ্বালানি পরিবহনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথটি আবার বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান। চলমান এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেওয়া বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার গভীর রাতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও দিনকয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, এই ছাড়ের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। তবে, তার সেই বক্তব্যের কয়েক দিন পরই এই নতুন সিদ্ধান্ত এলো। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র দাবি করেছে, ‘ব্যাংক, আইএমএফ ও জি-২০’ বৈঠকের ফাঁকে অংশীদার দেশগুলো এশিয়ায় চলমান চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের এক মুখপাত্র বলেছেন আলোচনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ায়, প্রয়োজনীয় দেশগুলোর কাছে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় ট্রেজারি।
রুশ তেল ক্রয়ে ছাড়ের মেয়াদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ একটি নতুন সাধারণ লাইসেন্স ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত জাহাজে বোঝাই করা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ ও বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ১৬ মে পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আগে বিশ্ব বাজারে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় রাশিয়ার তেল নিষেধাজ্ঞায় ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল ওয়াশিংটন; যা ১১ এপ্রিল শেষ হয়েছে। তবে ইরান, কিউবা এবং উত্তর কোরিয়া সংশ্লিষ্ট কোনো লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ছাড় কার্যকর হবে না। এর আগে গত মার্চ মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর থেকে বিধিনিষেধ সরিয়ে নিয়েছিলেন। মূলত ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া অস্থিরতা মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা জানানোর পর বৈশ্বিক জ্বালানিমূল্য ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে। তবে ইরান আবার হরমুজ বন্ধ করায় এই দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের ৮০টির বেশি তেল ও গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত মাসে বেসেন্ট বলেছিলেন, রুশ তেল কেনায় ছাড়ের ফলে প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছেছিল এবং যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করেছিল। অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজর্স নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রেট এরিকসন বলেন, আবারও ছাড়ের নবায়ন সম্ভবত ওয়াশিংটনের জারি করা শেষ ছাড় নবায়ন হবে না। এরিকসনের মতে, এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের স্থায়ী ক্ষতি করেছে, এগুলো স্থিতিশীল করতে যে উপকরণ বা ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রথম ছাড়ের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছিলেন, এই ছাড় রাশিয়ার ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেবে। সারা বিশ্বে এক দিনে এই পরিমাণ তেল উৎপাদিত হয়। নিষেধাজ্ঞা থেকে এই সাময়িক ছাড় বিশ্বে তেলের সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি করতে পারে। ইরান যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হতো।