১০ বছরে ৯ বছরই মুনাফা বিপিসির

জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও ভোগান্তি থেকে স্বস্তি মেলেনি সাধারণ মানুষের। বরং গতকালও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেল কিনতে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ক্রেতাদের। এতে প্রশ্ন উঠেছে মূল্যবৃদ্ধির পর সরবরাহ পরিস্থিতির আদৌ উন্নতি হবে কি না।

এ অবস্থায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানির মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপিসির অধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়াতে। গতকাল রাতে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে, ফলে আজ সোমবার থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলো বাড়তি তেল পাবে।

বিশ্ব পরিস্থিতিও জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বিঘœ ঘটে এবং দাম বাড়তে শুরু করে। মার্চ মাসে সরকার দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়েছে।

১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও আমরা জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত নিইনি। এ খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার চেষ্টা করছে আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে।’

সাধারণত মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলেও এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। গত শনিবার রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের আগস্টে এক ধাপে লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছিল, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক বাজারে।

দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের দায়িত্ব সরকারের ওপর। আমদানির সময় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর আরোপ করা হয় এবং বিক্রির সময়ও কর নেওয়া হয়। ফলে এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসে। পাশাপাশি তেল বিক্রির মুনাফা থেকে সরকার লভ্যাংশও পায়। বিপিসি এবং এর অধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানিগুলো নিয়মিত মুনাফা করছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, এ বছরের প্রথম ৮ মাসেও ১ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে বিপিসি। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে তাদের ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো লোকসান হয়েছে। এপ্রিলে লোকসান আরও বাড়তে পারে। তাই ঘাটতি কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন দামে বিপিসির মাসে বাড়তি আয় হতে পারে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি নিট মুনাফা করে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় শুরু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই মুনাফা ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। গত এক দশকের মধ্যে ৯ বছরই প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছে; শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিপিসির মুনাফা এক হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চ মাসে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে এবং এপ্রিলে তা আরও বাড়তে পারে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন দামে মাসে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হতে পারে, যার মধ্যে ডিজেল থেকে আসবে ৬০০ কোটি টাকার মতো।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে মজুদ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন এবং আগামী দুই সপ্তাহে আরও ৪ লাখ ৭৮ হাজার টন যুক্ত হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে চারটি জাহাজে এক লাখ টনের বেশি ডিজেল দেশে এসেছে। এ ছাড়া সরাসরি ক্রয়ের আওতায় থাকা কোম্পানিগুলো সরবরাহ দিলে মজুদ আরও বাড়বে।

সম্প্রতি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। গত মাসে ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৬ শতাংশ কমানো হয়েছিল। এখন সেই ঘাটতি কাটাতে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা আসছে। গত বছরের সরবরাহের ভিত্তিতে নতুন করে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে।

বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। অকটেন মজুদ করার সক্ষমতা আছে ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত অকটেন মজুদ ছিল ২৯ হাজার ৪৮৪ টন। এ ছাড়া ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে, যা খালাস হলে মজুদ সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাবে। দেশীয় উৎপাদনও নিয়মিত চলছে।

এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার মার্চে দিনে গড়ে অকটেনের সরবরাহ বেড়েছে ২৬ টন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে ৫৬ টন। এখন অকটেন সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসে সাধারণত জ্বালানি তেল হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়। বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন। অকটেনের পাশাপাশি মোটরসাইকেলে পেট্রোল ব্যবহৃত হয়। পুরনো ব্যক্তিগত গাড়িতেও কেউ কেউ পেট্রোল ব্যবহার করেন।

বর্তমানে পেট্রোলের মজুদ আছে ১৮ হাজার ৮৩০ টন। এটি শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। আগের বছরের তুলনায় গত মাসে ১৫ শতাংশ পেট্রোল কম সরবরাহ করা হয়েছে। এপ্রিলে কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। এখন সেটিও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।