যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল নিয়ে চরম ভোগান্তি আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গত শনিবার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। সেই সঙ্গে এ মাসেই দুই দফায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়ে গেছে লোডশেডিং। ব্যাহত হচ্ছে কারখানার উৎপাদনও। তেলের বাড়তি দাম আর সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত কৃষক। পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে আগেই। এখন গণপরিহনের ভাড়া বৃদ্ধিরও তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই গণপরিবহন ও বাজারসহ সব খাতেই মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সেটি হলে বর্তমান ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ আরও বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে এবং তেল সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বাড়ালেও তেলের সরবরাহ বাড়বে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি সরকারকে আপাতত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় থেকে সামান্য স্বস্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতি আরও কতটা চাপের মুখে পড়তে হবে, তা এখনো অজানা।
ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেল সংকট তীব্র হতে শুরু করে এবং এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে। ঢাকাসহ সারা দেশেই পেট্রোলপাম্পগুলোতে তীব্র ভিড় দেখা যাচ্ছে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে। যদিও সরকার বরাবরই বলে আসছিল যে, তেলের কোনো সংকট নেই।
জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে বিকল্প উদ্যোগগুলো না নিলে মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
মূল্যস্ফীতি দিয়ে কোনো একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে পরবর্তী আরেকটি সময়ে দাম কেমন বেড়েছে সেটি বোঝা যায়। অর্থাৎ আগের বছর বা মাস বা কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে খাদ্য, কাপড়, পোশাক, বাড়ি, সেবা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানের মূল্যবৃদ্ধির যে পার্থক্য সেটাই মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ আর মার্চ মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি হয়তো সরকারের নিরুপায় সিদ্ধান্ত। তবে শুল্কসহ মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সমন্বয় করতে হবে, যাতে ভোক্তাকে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি মূল্যে কিছু কিনতে না হয়।
যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তেলের দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। তার দাবি, তেলের দাম নগণ্যই বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে; কিন্তু এটা করা হয়েছে দাম সমন্বয়ের জন্য।
জ্বালানি তেল ও এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব : শনিবার রাতে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরদিন গতকাল রবিবার বাড়ানো হয় এলপিজির দাম। এ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম এক মাসে দুবার বাড়ানো হলো। এতে দৈনন্দিন বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেবে তা নিয়ে চিন্তিত সাধারণ মানুষ।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অকটেনের দাম বেড়ে প্রতি লিটার ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন মূল্য অনুযায়ী পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হবে।
মূল্যবৃদ্ধির আগে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা ও পেট্রোলের মূল্য ১১৬ টাকা ছিল।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির পক্ষ থেকে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর সুপারিশ করে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা যায় কি না দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম এর মধ্যেই অনেকাংশে বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এমনকি দেশে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্যসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আবার কাঁচামালের পাশাপাশি বিদেশ থেকে পণ্য আনা এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য পরিবহন খরচও বেড়েছে।
ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলছিলেন, ‘তেলের দাম বাড়ল, এলপিজির দামও বাড়ল দুই দফা। এতে জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের দামও চড়া। এভাবে খরচ বাড়লেও মাসিক আয় তো বাড়ছে না। বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেব?’
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব খাত তথা পুরো অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিনের আমদানিমুখী নীতি আর দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে অবহেলার কারণেই এখন বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। এ নিয়ে মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা না থাকায় তৈরি হয়েছে বড় সংকট।
আইএমএফের পরামর্শে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার নামে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সব ভর্তুকি তো ক্ষতিকর নয়। ইউরোপ-আমেরিকা কৃষিতে ভর্তুকি দেয়। কিন্তু সেটা নিয়ে আইএমএফ কথা বলে না।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকার সময় এক দশকে বিপিসি বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে। সেখান থেকে ভর্তুকি দেওয়া হলে এখন তেলের দাম বাড়ানোর দরকার ছিল না। কিন্তু সেই অর্থ কী হয়েছে, তা কেউ জানে না।
বর্তমান এ সংকট কাটাতে জ্বালানির অপচয় রোধ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বিলাসিতা পরিহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে আমদানিনির্ভরতা কমানোরও পরামর্শ তার। এসব না করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।
শিল্পে ব্যয় বেড়েছে, উৎপাদন ব্যাহত : একদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট। সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। সব মিলে শিল্প কারখানায় উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি ব্যয়ও অনেক বেড়েছে।
কারখানার মালিকরা বলছেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। আবার চাহিদামতো ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানার মালিকরা বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই। আবার সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির পরও সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা বড় উদ্বেগজনক।
‘বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে শিল্পে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি হয়েছে। একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা সময়মতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না। এ বিষয়গুলো সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি যেভাবেই হোক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে : জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিতেও সরাসরি আঘাত লাগে। শনিবার অন্যান্য জ্বালানি তেলের সঙ্গে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বাড়তি মূল্যের পাশাপাশি চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
দেশের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহন সবকিছুই মূলত ডিজেলনির্ভর। ফলে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপ সৃষ্টি করবে সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়ের ওপর। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এই বাড়তি ব্যয় বহনে হিমশিম খান। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হন আবাদ কমিয়ে দিতে।
কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদা মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল এই সময়টাতেই ডিজেলের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় আবাদ হয় এই বোরো মৌসুমে। কৃষকরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বোরো চাষে উৎপাদন খরচ বেশ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। হুমকিতে পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
তিনি বলেন, ‘এখন বোরো ধানে সেচ দেওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু কৃষকরা ঠিকমতো সেচ দিতে পারছেন না। এতে ব্যয় বাড়বে, উৎপাদনও কমে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডির তথ্যমতে ফলন সাড়ে ৭ শতাংশ কমবে। তবে আমাদের আশঙ্কা ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।’
সমাধান হিসেবে তার পরামর্শ হলো কৃষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষককে নগদ প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব : ২০২২ সালে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ার বিপরীতে ভাড়া বেড়েছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। কিন্তু এবার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে মাত্র ১৫ টাকা বাড়লেও বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ৬৪ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির আবদার করা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
এদিকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। তারা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গতকাল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে (বিআইডব্লিওটিএ) চিঠি পাঠিয়েছে।
জ্বালানি সংকটে বেড়েছে লোডশেডিং : জ্বালানি নিয়ে টানাটানির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রামে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। লোডশেডিংয়ের প্রভাবে গরমে জনজীবনে হাঁসফাঁস শুরু হয়েছে। শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বা পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হচ্ছে।
পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন কম হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। এর কারণ জ্বালানি সংকট। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রভাব পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্কেও : দেশে চলমান লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয়। বিদ্যুৎ গ্রিডের অনিয়মিত সরবরাহে নেটওয়ার্ক পরিচালনা এখন প্রায় পুরোপুরি জেনারেটর-নির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে দৈনিক জ্বালানির চাহিদা বেড়ে প্রায় ১ লাখ লিটারে পৌঁছেছে।
মোবাইল অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মোবাইল বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালু রাখতে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন। এর বাইরে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং অবকাঠামো সচল রাখতে আরও ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। তবে ইরান যুদ্ধের পর শুরু হওয়া জ্বালানি সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে এর প্রভাব দ্রুত মোবাইল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা অপারেটরদের।
মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ডেটা সেন্টারগুলোয় দৈনিক প্রায় ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা আছে। বিদ্যুৎ না থাকলে এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার জ্বালানি লাগে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা সাড়ে ১৮ কোটির বেশি। অপারেটরদের আশঙ্কা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটলে প্রথমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়বে। এরপর শহরাঞ্চলেও দেখা দিতে পারে কল ড্রপ, ডেটা সেøাডাউন ও আংশিক নেটওয়ার্ক অচল হওয়ার মতো ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালু রাখতে না পারলে নির্দিষ্ট এলাকায় সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।
এই পরিস্থিতিতে শনিবার বিটিআরসিকে জরুরি চিঠি দিয়েছে অ্যামটব। চিঠিতে বলা হয়েছে, ঝড়ের সময় দেশের অনেক এলাকায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত টানা লোডশেডিং হচ্ছে। এ কারণে অপারেটররা পুরোপুরি জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।