বৈশ্বিক তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাপ এখন আর শুধু অস্বস্তির কারণ নয়-এটি বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠছে। জানা যায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে অধিকাংশ ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করে। শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমুদ্রও এই ভয়াবহ উত্তাপ থেকে মুক্ত নয়। সেখানে তাপপ্রবাহের কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে। ফলে মরছে মাছ, কমছে মৎস্যসম্পদ।
এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহ যত তীব্র হচ্ছে, কিছু অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ততই চরম সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বড় অংশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় বছরের প্রায় ২৫০দিন, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সময় কৃষকদের পক্ষে বাইরে কাজ করা অনিরাপদ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
গবাদিপশুর ওপর তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আগে থেকেই। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই তাপজনিত চাপ শুরু হয়। গরম বাড়লে দুধের উৎপাদন কমে, কমে দুধের চর্বি ও প্রোটিনের পরিমাণও। শূকর ও মুরগি ঘামতে পারে না বলে তাপমাত্রা বাড়লে তাদের হজমতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে, এমনকি হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হয়। ফসলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র।
তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আশার কথাও আছে। আগেভাগে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হওয়ায় কৃষকদের সময়মতো সতর্ক করা যায়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও মুঠোফোনের মাধ্যমে এই সতর্কবার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব সম্পদ ইনস্টিটিউটের কৃষি উদ্যোগ বিভাগের পরিচালক রিচার্ড ওয়েট বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে এখনই খাপ খাওয়ানো শুরু করতে হবে। কৃষকদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে সঠিক সরঞ্জাম, জ্ঞান আর সময়মতো সতর্কবার্তা।নিয়োগদাতাদের ছায়া, বিশ্রাম ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মিডলবুরি কলেজের খাদ্যবিষয়ক অধ্যাপক ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থাবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য মলি অ্যান্ডারসন বলেন, বর্তমান শিল্পভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থা মুষ্টিমেয় কিছু ফসল ও বিশেষায়িত উৎপাদন পদ্ধতির ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে এটির তীব্র তাপপ্রবাহের বড় ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা নেই। মলি অ্যান্ডারসন খাদ্যব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার পক্ষে কথা বলেন এবং নিবিড় চাষের কারণে খামার থেকে গাছপালা, ছায়া ও মিশ্র চাষের ধারা হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। মলি অ্যান্ডারসন বলেন, একসঙ্গে অনেক ফসল নষ্ট হলে দাম, সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় নামবে। অভিযোজনের একটা সীমা আছে। আসল সমাধান হলো জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া এবং অভিযোজন ব্যবস্থায় জোরালো বিনিয়োগ করা।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক টিম ল্যাং বলেন, গরমপ্রবণ দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঠিকই, তবে নাতিশীতোষ্ণ এলাকা ও ধনী দেশগুলোও নিরাপদ নয়। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা দ্রুত বাড়ছে এবং তা গোটা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদকদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হাজির করছে।