দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা আর হতাশার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১০ বছর পর মামলার এক সন্দেহভাজন সাবেক সেনা সদস্য হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিচারের আশার আলো দেখতে শুরু করেছে।
তনুর পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, হত্যাকাণ্ডের পর মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
তাদের দাবি, ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলেও সেগুলো কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। দীর্ঘ সময় পর হলেও প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দেখতে চান তারা।
কুমিল্লার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, শুরু থেকেই ‘অদৃশ্য চাপ’ তদন্ত কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে এত বছরেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সেই স্থবিরতা কাটার ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, আমরা মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তদন্তের মাধ্যমে সবকিছুই সামনে আসবে।
মেয়ের হত্যার বিচার দেখতে চান তনুর মা আনোয়ারা বেগম। তার কণ্ঠে এখনও শোক আর প্রত্যাশার মিশেল, আমি কখনো আশা ছাড়িনি। আল্লাহর কাছে চাইছিলাম,মরার আগে যেন বিচারটা দেখি। একজন ধরা পড়ছে, বাকি যারা আছে তাদেরও ধরতে হবে। আমি আমার মেয়ের খুনিদের ফাঁসি দেখতে চাই।
এ বিষয়ে তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের অভিযোগ, শুরু থেকেই তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও তা করতে দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, ১০ বছর ধরে শুধু একটাই কথা শুনেছি-বিচার হবে না? এখন মনে হচ্ছে, হয়তো সত্যিই বিচার পাব।
পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন মহলও চায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করা হোক। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি কাইমুল হক ওরফে রিংকু বলেন, আইন সবার জন্য সমান-এটা বাস্তবে প্রমাণ হওয়া দরকার।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়ের ভাষায়, বিচারহীনতা অপরাধকে উৎসাহিত করে। আমরা চাই না, এই মামলাও আবার অন্ধকারে হারিয়ে যাক।
গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে তনু হত্যার অভিযোগে হাফিজুর রহমানকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মুমিনুল হক তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী হাফিজুর ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে। হাফিজুর রহমানের পাশাপাশি অপর দুই সন্দেহভাজন হলেন তৎকালীন সেনাসদস্য সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম (পরিবারের দাবি অনুযায়ী নাম নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে)। ইতোমধ্যে হাফিজুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। তবে দুই দফা ময়নাতদন্তেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি।