ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আড়াইশর বেশি শিক্ষার্থী। ছোট হলেও তাদের কল্পনাশক্তি আকাশছোঁয়া। এ বছর এই বিদ্যালয়ের ৪৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ জন বৃত্তি পেয়েছে। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, উদ্ভাবনী শক্তিতেও যে তারা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে প্রমাণ মিলেছে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী মেলায়।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘কোনো কিছু উদ্ভাবনের জন্য জ্ঞানের চেয়ে বেশি প্রয়োজন কল্পনাশক্তি।’ এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু কল্পনায় তারা সীমাহীন। মেলার দিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উদ্ভাবনের বিচিত্র প্রদর্শনীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ। বৈচিত্র্য, রোমাঞ্চ এবং সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছিল ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের ৫০-এর অধিক আবিষ্কারে।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইরাম, রাফি ও সাকি তৈরি করেছে সোলার লুনার মডেল। যার সাহায্যে সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব। সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে আদিব ও মেহেদী বানিয়েছে নতুন ট্রাফিক সিস্টেমের মডেল, যা গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করে অবাঞ্ছিত ক্ষতি রোধ করতে সক্ষম।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফুয়াদ, জুনায়েদ ও রাদ তৈরি করেছে বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তিনটি ভিন্ন মডেল। প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি কমানোই তাদের লক্ষ্য। তবে প্রতিরক্ষা চিন্তাভাবনাতেও পিছিয়ে নেই ক্ষুদেরা। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে বানিয়েছে যুদ্ধবিমানের মডেল। অন্যদিকে নাবিল হাসান মাহাদি ও হাসান জাফির বানিয়েছে ‘আইরন ডোম’-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান বিধ্বংসী লেজার মিসাইল প্রজেক্ট। তাদের লক্ষ্য দেশকে বাইরের যেকোনো হুমকি থেকে রক্ষা করা।

ঘরবাড়ি ও খামারের জিনিসপত্র চোরের হাত থেকে রক্ষা করতে তাশফিক ও তামিম তৈরি করেছে লেজার নিরাপত্তা অ্যালার্ম। দূরবর্তী স্থানে চিকিৎসা ও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে জুনায়েদ হাসান বানিয়েছে ড্রোন মডেল। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিকা, রোযা ও জুবা আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে নিরাপদ বসবাসের জন্য নতুন গৃহমডেল প্রদর্শন করেছে। পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে মাইশা প্লাস্টিকের বর্জ্য থেকে নানা রঙিন ফুলদানি ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করেছেন। এ ছাড়া মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম, মাটির ঘর, শহীদ মিনার, বিভিন্ন ধরনের ফুল, রংধনু, গাড়ির মডেল, চাঁদ ও সৌরজগতের মডেলসহ আরও অসংখ্য আকর্ষণীয় উদ্ভাবন উপস্থাপন করেছে ক্ষুদে এই বিজ্ঞানীরা।

প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তুবা জানায়, ‘এই উদ্ভাবনী মেলায় অংশ নিতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। পাশাপাশি বন্ধুদের উদ্ভাবন দেখেও অনেক কিছু শিখছি। আমিও সেচ ব্যবহারের সহজ পদ্ধতির একটি মডেল বানিয়েছি, যার মাধ্যমে পানির অপচয় কমিয়ে সেচ দেওয়া যাবে।’

প্রদর্শনী পরিদর্শন করে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘এ ধরনের উদ্ভাবনী মেলার মাধ্যমে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎ উর্বর হচ্ছে। তাদের শ্রম, মেধা ও কল্পনার দারণ প্রকাশ দেখা যাচ্ছে এখানে। তোমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলবে যেখানে সব ধরনের পেশাজীবী ও মানসিকতা সমানভাবে মূল্যায়িত হবে।’

বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মেধা ও সহযোগিতা দিয়েই এই উদ্ভাবনী মেলার আয়োজন সম্ভব হয়েছে। তারা অনেক পরিশ্রম করেছে। আমি তাদের সাফল্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। তাদের কাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে সবাইকে পুরস্কৃত করা হবে।’

ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ ও সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। পরবর্তী আয়োজনে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্ভাবন নিয়ে হাজির হবে এমন আশা আয়োজকদের।