পিরোজপুরের কাউখালীতে বোর্ড পরীক্ষার কেন্দ্রে চরম অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে পরীক্ষার ফলাফল ও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে ৪ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী। ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাসে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে তাদের প্রথম দিন ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। অথচ পরদিনই আবার ২০২৬ সালের সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। একই কেন্দ্রে দুইদিনে দুই নিয়মে পরীক্ষা নেওয়ায় হতবাক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
২১ এপ্রিল কাউখালীর সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে (কেন্দ্র কোড -৪১২) বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে যায় হোগলা বেতকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিনজন ও উত্তর নীলতী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এই চার শিক্ষার্থী ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ও স্কুলের শিক্ষকদের পরামর্শে তারা ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাস অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু পরীক্ষার হলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের প্রশ্নপত্র।
হতভম্ব শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের প্রশ্ন চাইলে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানায়, তোমরা অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাই তোমাদের ২০২৫ সালের সিলেবাসেই পরীক্ষা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে অপ্রস্তুত অবস্থায় পুরনো সিলেবাসে পরীক্ষা দেয় তারা।
তবে ২৩ এপ্রিল বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষায় ওই শিক্ষার্থীদেরকে আবার ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাসের প্রশ্ন দেওয়া হয়। একই শিক্ষার্থীর দুইদিনে দুই সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
এঘটনায় অভিযোগের তীর কেন্দ্র সচিব ও সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আকতার হোসেন হাওলাদারের দিকে।
তবে এবিষয়ে তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীদের বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে নেওয়ার বিষয়টি তিনি জানতেন না। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাকে বিষয়টি জানায়নি। পরে তিনি জানতে পেরে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলে বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাসে নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষায় ২০২৬ সালের প্রশ্নের বদলে ২০২৫ সালের প্রশ্ন দেওয়ায় তারা আপত্তি তুললেও তাদেরকে ২০২৫ প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। পরে তাদেরকে এ ঘটনা চেপে যেতে বলার ও অভিযোগ করেন তারা।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড জানায়, কেন্দ্র সচিব আকতার হোসেন এ বিষয়ে তাদেরকে কিছুই জানাননি। তাছাড়া বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত ম্যানুয়ালে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, নিয়মিত ও অনিয়মিত উভয়ই ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাসে পরীক্ষা দেবে।
উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী প্রিয়াঙ্কা হাওলাদার বলেন, আমি শারীরিকভাবে অনেকটাই অসুস্থ। তারপরেও অনেক কষ্ট করে সারা বছর ২০২৬ সালের শর্ট সিলেবাসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম কিন্তু প্রথম দিনের পরীক্ষায় ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের প্রশ্নপত্র দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। স্বাভাবিকভাবেই বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা আমার ভালো হয়নি।
অভিভাবক রিক্তা বেগম বলেন, দুই দিনে দুই সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে আমার ছেলের একটা পরীক্ষাও ভালো হয়নি। তিনি ও তার পরিবার ছেলের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত। তিনিও এসএসসি পরীক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ জাতীয় তামাশার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তি দাবি করেছেন এই অভিভাবক।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও কেউন্দিয়া শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শামসুর রহমান মিজান বলেন,পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন বিভ্রাটের সম্পূর্ণ দায় কেন্দ্র সচিব আকতার হোসেনকেই বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে আকতার হোসেন যথেষ্ট খামখেয়ালি ও অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন।
কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো.ইদ্রীস আলী আযিজী বলেন, দুই দিনে দুই ধরনের সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। আশা করছি ঘটনা তদন্ত পূর্বক তারা দায়ী ব্যক্তিদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনবেন।
এ বিষয়ে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, বর্তমান সরকারের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আমরা অত্যন্ত আন্তরিক। পরীক্ষা কেন্দ্রেগুলোতে কোন প্রকার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। ভুল প্রশ্ন পত্রে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত-পূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।