রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে ভাইভা বোর্ডের সুপারিশকৃত দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘যোগ্য’ প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তালিকার চতুর্থ নম্বর প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমনকি এতে বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. ইস্রাফিল মেধাতালিকার চূড়ান্ত ফলাফলে স্বাক্ষর না করায়, তার স্বাক্ষর ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট নিয়োগটির অনুমোদন দেয়। এতে নিয়োগটি নিয়ে জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ভাইভা বোর্ডের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা নিয়োগ প্রত্যাশী প্রার্থীর নাম এ সালাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ থেকে ২০০৮ স্নাতক ও ২০০৯ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এম. ফিল এবং ২০১৯ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ভালো ফলাফলের স্বীকৃতিসরূপ দুটি স্বর্ণপদক পান। একটি গবেষণা পুস্তকসহ বেশকিছু গবেষণা আর্টিকেল রয়েছে তার। তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে ই-মেইলযোগে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নিয়োগ বোর্ড সদস্য ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রথমে উর্দু বিভাগে তিনজন প্রভাষকের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সেই বিজ্ঞপ্তি বাদ দিয়ে নতুন করে আবার একই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে গত বছরের ৭ আগস্ট তিন পদের লিখিত পরীক্ষায় ৪৩ জন প্রার্থী অংশ নেন। নিয়ম অনুযায়ী, পদ সংখ্যার তিনগুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। তবে আগেও একবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ায় উর্দু বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির চিঠি ও রেজিস্ট্রার দপ্তরের নির্দেশনায় ছয়জনকে প্রভাষক পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১৮ জন নিয়োগ প্রত্যাশীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষা ও একাডেমিক ফলাফল বিবেচনায় ছয়জন প্রার্থীর নাম ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয় এবং নিয়োগ অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
তবে নিয়োগটি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপনের আগে নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিলকে আবার ক্যাম্পাসে আনা হয়। এরপর তাকে ছয়জন নয়, তিনজনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তিনি চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর করতে গিয়ে দেখেন, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীর জায়গায় চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীর নাম ঢুকানো হয়েছে এবং তালিকায় তাকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। কিন্ত তিনি অনিয়মের অভিযোগ করে অধ্যাপক ইস্রাফিল শিক্ষক চূড়ান্ত মেধা তালিকায় স্বাক্ষর না করেই চলে আসেন। এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেটে নিয়োগটি অনুমোদন দেয় সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব প্রশাসন।
এ বিষয়ে নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল বলেন, প্রথমে তিনজন প্রভাষক নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বোর্ডের সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে ছয় প্রার্থীর নাম ক্রমানুসারে সাজানো হয়। পরে আমি ঢাকা চলের আসার পর আবার আমাকে ক্যাম্পাসে ডেকে ছয় জনের পরিবর্তে তিনজনকেই নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। তবে এখানে যিনি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন, তাকে বাদ দিয়ে চতুর্থ জনকে অগ্রাধিকার দিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দিতে এটি করেছেন বলে উল্লেখ করেন এই অধ্যাপক। অধ্যাপক ইস্রাফিল বলেন, এটার প্রতিবাদ করে ভিসি স্যারকে বলেছিলাম, স্যার আপনি নিজেই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়... কাকে রাখা হবে, সকলের সম্মতিতে আপনিই লিখেছিলেন। এখানে বিবেচনা ছিল ভাইভার পারফর্ম্যান্স ও একাডেমিক ক্যারিয়ার। তারা বলার চেষ্টা করেছেন, যেহেতু তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাকে প্রায়োরিটি দেওয়া আরকি। তখন মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর একটা কথা বলেছিলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করলে এটা শোভনীয় হয় না, কিন্তু সামগ্রিক কথা চিন্তা করে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
বাদ পড়া নিয়োগ প্রত্যাশী ড. এ সালাম বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে নির্বাচিত হয়েও পরে কোনও কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া, এটা অবশ্যই বড় ধরনের জালিয়াতি। আমার সঙ্গে বেইনসাফি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের স্বাক্ষর ছাড়াই সিন্ডিকেটে নিয়োগটি পাস করার পেছনে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম থাকতে পারে।’ এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানান অভিযোগকারী।
উর্দু বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘বিগত নকীব প্রশাসন তাদের জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ দিতে নানা আয়োজন করেছে। তার উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগেও অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তিন পদের বিপরীতে আঠারোজনের ভাইভা নেওয়া হয়েছে। আবার চূড়ান্ত শিক্ষক মেধাতালিকায় বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের স্বাক্ষর ছাড়াই নিয়োগকার্য সম্পন্ন করা হয়েছে। এটি কার্যত অনিয়ম করা হয়েছে।’
এই অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য এবং নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি সালেহ্ হাসান নকীবকে। তিনি বলেন, ‘যেখানে অনিয়ম হয়নি, সেখানে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই।’
নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনে করতে পারছি, একটা জায়াগায় বোধহয় তিনি স্বাক্ষর করেননি। বোর্ডে মোট পাঁচজন সদস্য ছিল। সবাই একমত হবেন, এমন কোনো কথা নেই আরকি। সো, অনিয়মের কোনো প্রশ্নই নেই।’
পদ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির চিঠি ও রেজিস্ট্রার দপ্তরের যে নির্দেশনা, সেই অনুসারে ১৮ জন প্রার্থীর ভাইভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। রেজিস্ট্রার দপ্তর ও প্ল্যানিং কমিটির সবশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬ জন শিক্ষক নিতে কোনো অসুবিধা ছিল না। তবে আমরা সিন্ডিকেটের আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনের ভিতরে রেখেছি। ভাইভায় বেশি ডেকে নিয়ে যদি প্রথম তিনজনকে নিয়ে নেই কোনো অসুবিধা নেই তো।’
দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘ভাইভা বোর্ডে সিরিয়াল শুধু মেধার ভিত্তিতে করা হয়, বিষয়টা এমন নয়। এখানে অনেক সময় জ্যেষ্ঠতা ও পিএইচডি ডিগ্রি আছে কি না সেটা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে সিরিয়াল করা হয়। এ ছাড়া যাকে বাদ দেওয়া হয়েছে তার বয়স ফিফটি প্লাস ছিল। সবদিক বিবেচনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
যদিও বাদ পড়া প্রার্থী ড. এ. সালামের বয়স ছিল ৩৯ বছর। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগে এর চেয়ে বয়স্ক প্রার্থীদেরকে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে।
এই অনিয়মের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগটি আমার নজরে আসেনি। বিশেষজ্ঞ সদস্যের অমত থাকতে পারে, কিন্ত স্বাক্ষর না করলে সমস্যা। যদি অভিযোগ পাই, তাহলে অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে।’